স্পেন ও ফ্রান্সে নিয়ন্ত্রণহীন দাবানলের কারণে প্রায় ২ লাখ মানুষকে তাদের বাড়িঘর ও পর্যটনকেন্দ্র থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফ্রান্স আন্তর্জাতিক সহায়তা চেয়েছে। অন্যদিকে স্পেন সরকার জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। দাবানল নিয়ন্ত্রণে দুই দেশের হাজার হাজার অগ্নিনির্বাপণকর্মীর সঙ্গে সেনাবাহিনীও কাজ করছে।গ তকাল স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালান অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা। তবে বাতাসের দিক ও গতির আকস্মিক পরিবর্তনে আগুন আরো ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাজধানীর পশ্চিম আকাশ ঘন ধূসর ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে।

মাদ্রিদ আঞ্চলিক সরকারের জরুরি ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান কার্লোস নোভিয়ো বলেন, রাজধানীর কাছের দাবানলটি বর্তমানে সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে রয়েছে যে অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর বিদ্যমান সক্ষমতা দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

শুক্রবার পৃথক দুটি দাবানল একত্র হয়ে বিশাল অগ্নিকাণ্ডে রূপ নেয়। পরে আগুনটি পার্শ্ববর্তী কাস্তিয়া ই লিওন অঞ্চলের আরেকটি দাবানলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। আগুনগুলো এক হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মাদ্রিদ অঞ্চলে অন্তত ২৫ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ২০০ জনের বেশি বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন।

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গতকাল বোর্দোর আশপাশের শহরতলি থেকে হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়। বোর্দো অঞ্চল ঘিরে আগুন কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। নুভেল-আকিতেন ও জিরোন্দ অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান সোফি ব্রোকা জানান, লে হায়ান, আইসিন ও মেরিনিয়াক এলাকা খালি করা হচ্ছে। বোর্দো অঞ্চল বিখ্যাত আঙুরবাগানের জন্য পরিচিত। একই সঙ্গে আটলান্টিক উপকূলের পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় যাওয়ার অন্যতম প্রধান যোগাযোগকেন্দ্র এটি।

বোর্দোর দক্ষিণে অভিজাত পর্যটন এলাকা ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপ থেকে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ পালিয়ে গেছে। আগুনে অঞ্চলটির একমাত্র সড়ক হুমকির মুখে পড়ে। নৌকায় করে কয়েকশ মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়। অন্যরা ব্যক্তিগত গাড়িতে এলাকা ছাড়ে। ধনী ব্যক্তিদের বিলাসবহুল বাড়ির জন্য পরিচিত উপদ্বীপটিতে এরই মধ্যে ৫০টির বেশি বাড়ি পুড়ে গেছে।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, জিরোন্দ ও লান্দ অঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪১ হাজারের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্রান্সে চলমান দাবানল অতীতে কখনো দেখা যায়নি—এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফরাসি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।

এরই মধ্যে স্পেন ও ফ্রান্সে দাবানল নিয়ন্ত্রণে উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইতালিতেও চলতি সপ্তাহে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে; সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সিসিলিতে আগুন নেভাতে গিয়ে এক অগ্নিনির্বাপণকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ইইউর কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্যমতে, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ। ১৯৮০-এর দশক থেকে এখানকার তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি হারে বাড়ছে। উচ্চ তাপমাত্রা ও শুষ্কতায় গাছপালার আর্দ্রতা কমে গিয়ে সেগুলো সহজেই আগুনের জ্বালানিতে পরিণত হচ্ছে। মানুষের অসতর্কতা বা ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড এবং বজ্রপাত থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে; তবে তীব্র গরম, শুষ্ক উদ্ভিদ ও প্রবল বাতাস আগুনকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয় এবং নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তোলে।

ইউরোপীয় বন অগ্নিকাণ্ড তথ্যব্যবস্থার হিসাবে, চলতি বছর এরই মধ্যে ইউরোপে যে পরিমাণ ভূমি পুড়েছে, তা গত দুই দশকের বার্ষিক গড়ের চেয়ে বেশি। ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থা বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনে মহাদেশজুড়ে বন অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেড়েছে, যার সবচেয়ে বড় হুমকিতে রয়েছে দক্ষিণ ইউরোপ।