মধ্য আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। দেশটির সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ২ হাজার ৯৭৩ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ১ হাজার ৩০৯ জন। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সংক্রমণের গতির দিক থেকে এটি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করা ইবোলা প্রাদুর্ভাব। এমন সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যেই বকেয়া বেতন ও প্রণোদনা পরিশোধের দাবিতে পূর্বাঞ্চলের একটি প্রধান ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘট শুরু করেছেন।

গতকাল ইতুরি প্রদেশের বুনিয়া শহরে অবস্থিত এলিকিয়া ইবোলা ট্রিটমেন্ট সেন্টারের চিকিৎসক, নার্স ও নিরাপত্তাকর্মীরা কাজ বন্ধ করে দেন। এতে প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত চিকিৎসাকেন্দ্রটির কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়ে। প্রায় ১০০ স্বাস্থ্যকর্মী কেন্দ্রটির বাইরে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া প্রণোদনা পরিশোধ না করায় কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়ছে এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

এক বিবৃতিতে কেন্দ্রটির কর্মীরা জানান, দুই মাসের বকেয়া কর্মদক্ষতা প্রণোদনা পরিশোধে ‘সুনির্দিষ্ট সমাধান’ না পাওয়া পর্যন্ত শনিবার থেকে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেয়া হয়েছে। তারা দ্রুত বকেয়া অর্থ পরিশোধ করে কাজে ফেরার পরিবেশ তৈরির জন্য কঙ্গো সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে গত সপ্তাহে বুনিয়া জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরাও বকেয়া বেতনের দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেন। হাসপাতালটি ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র। কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর কাজে যোগ দিলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো অর্থ পাননি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এ পর্যন্ত ১০০ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন। গত ১৫ মে থেকে কঙ্গো বিরল বান্ডিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে বর্তমানে ৭৬৬ জন রোগী আইসোলেশন বা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৫৪০ জন।

নিশ্চিত আক্রান্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশের বাসিন্দা। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সংক্রমিতদের শনাক্ত ও তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেও রোগটি তাদের অনুসন্ধানের সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রাদুর্ভাবের প্রথম রোগী বা ‘পেশেন্ট জিরো’কে এখনো শনাক্ত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। পূর্ব কঙ্গোয় চলমান সশস্ত্র সংঘাতের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং খনিসংশ্লিষ্ট শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের চলাচলও সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা হাজারো মানুষকে শনাক্ত করা কঠিন করে তুলেছে।

অর্থসংকট, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অবিশ্বাস এবং পূর্বাঞ্চলের চলমান সংঘাত ইবোলা মোকাবেলার কার্যক্রমকে আরো দুর্বল করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে বান্ডিবুগিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা না থাকায়। কঙ্গোর আগের অধিকাংশ ইবোলা প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী জাইরে প্রজাতির ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা থাকলেও বর্তমান ভাইরাসটির ক্ষেত্রে তা নেই।

তবে ইতুরি প্রদেশে সম্ভাব্য দুটি ইবোলা চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর বহুল প্রতীক্ষিত একটি গবেষণায় রোগী অন্তর্ভুক্তির কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, মধ্য আফ্রিকার বাইরে এ প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার বৈশ্বিক ঝুঁকি কম। ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে নয়, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের তরলের সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়। এ কারণে শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের তুলনায় এর বিস্তার তুলনামূলকভাবে কঠিন।