বিভিন্ন দেশের যাত্রী বহনকারী জাহাজটিতে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আরো কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার আগেই ওই প্রমোদতরী থেকে নেমে যাওয়া কয়েক ডজন যাত্রীর সন্ধানে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তৎপরতা শুরু করেছে। একই সঙ্গে এরপর থেকে তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদেরও শনাক্তের চেষ্টা চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হলেও সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি এখনো কম।

আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ তৈরি হলেও বাংলাদেশে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এখন থেকেই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে নজরদারি বাড়ানো, সন্দেহভাজন রোগী দ্রুত শনাক্ত করা এবং হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি রাখা জরুরি। একই সঙ্গে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।

ডব্লিউএইচও বলছে, হান্টাভাইরাসের সর্বশেষ যে সংক্রমণ দেখা গেছে, এটি নতুন কোনো মহামারীর সূচনা নয়। তবে ভাইরাসটির ইনকিউবেশন সময় দীর্ঘ হওয়ায় সামনে আরো কিছু সংক্রমণ শনাক্ত হতে পারে। তাই আতঙ্ক নয়, সতর্কতাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হান্টাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগের কারণ হচ্ছে, মানুষ এখনো এ ভাইরাস সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। সাধারণত জ্বর, বমি, শরীর ব্যথা দিয়ে শুরু হলেও পরে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও ডিহাইড্রেশন হতে পারে। গুরুতর অবস্থায় মৃত্যুঝুঁকিও থাকে। আমার মনে হয়, সবার আগে ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত করতে হবে। রোগী শনাক্ত করা, আলাদা রাখা এবং সংক্রমণ ঠেকানোর বিষয়ে আগেভাগে প্রশিক্ষণ জরুরি। হামের সময় যেমন মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়া ও রোগীকে আলাদা রাখার কথা বলা হয়েছে, এখানেও একই ধরনের সতর্কতা দরকার। এ ভাইরাস মূলত ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খাবার সংরক্ষণেও সচেতন হতে হবে। এখন যে জাহাজে সংক্রমণ হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক ভ্রমণের কারণে ঝুঁকিটা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’

আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে ১ এপ্রিল যাত্রা করে বিলাসবহুল ক্রুজ ‘এমভি হন্ডিয়াস’। এতে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ যাত্রী ও ক্রু ছিলেন। প্রথমে এক ডাচ যাত্রীর মৃত্যু হয়। পরে তার স্ত্রী দক্ষিণ আফ্রিকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ডব্লিউএইচও নিশ্চিত করেছে, তিনি হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এরপর আরো এক জার্মান যাত্রীর মৃত্যু হলে উদ্বেগ বাড়ে। জাহাজে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফিলিপাইন, রাশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ছিলেন।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মল, প্রস্রাব বা লালার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। তবে এ ঘটনায় শনাক্ত হওয়া অ্যান্ডিস স্ট্রেইনের ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে সীমিত আকারে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যদিও ডব্লিউএইচও বলছে, এটি কভিড-১৯-এর মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস নয়।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে জ্বর, ক্লান্তি ও শরীর ব্যথা দেখা দেয়। পরে শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর সমস্যা হতে পারে। এ ভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে দ্রুত চিকিৎসা পেলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ হান্টাভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে হান্টাভাইরাস নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে। তবে ইউরোপ ও এশিয়ায় এর সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।

হান্টাভাইরাস নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে সতর্ক থাকা জরুরি বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশ যেমন—ভারত, চীনে যদি রোগটি শনাক্ত হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যারা অন্যান্য দেশ থেকে আসছেন বা যাচ্ছেন, তাদের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরদারি বাড়ানো দরকার।’

কভিডের সময় যেমন বিমানবন্দরে তাপমাত্রা পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হতো, সে রকম ব্যবস্থা আবারো জোরদার করা যেতে পারে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘দেশের কোথাও অস্বাভাবিক মৃত্যু বা হঠাৎ জ্বর-শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গেলে দ্রুত এপিডেমিক ইনভেস্টিগেশন টিম পাঠিয়ে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে এটি হান্টাভাইরাস কিনা সেটিও শনাক্তের চেষ্টা করতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত আতঙ্কের কিছু নেই। সচেতনতা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্য নজরদারি জোরদার করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’