স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্রায় ৪৮ হাজার ৩০০ জন মরক্কোয় ফিরে যান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেসও বলেছেন, সিউতায় প্রবেশকারীদের কার্যত সবাই ফিরে গেছেন। তবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের দ্রুত প্রত্যাবর্তনেও স্বস্তি ফিরছে না স্পেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে। কারণ কয়েক ঘণ্টার এ অভিবাসী ঢল স্পেনের সীমান্ত নিরাপত্তা, শেনজেন ব্যবস্থার কার্যকারিতা, সরকারের অভিবাসন নীতি এবং মরক্কোর সঙ্গে মাদ্রিদের সম্পর্ক নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সিউতার জনসংখ্যা প্রায় ৮৪ হাজার। সেখানে মাত্র একদিনের মধ্যে ৫০-৬০ হাজার মানুষের প্রবেশ স্পেনের সীমান্ত ব্যবস্থাকে কার্যত ভেঙে দিয়েছিল। কেউ সাঁতরে, কেউ পাথরের বাঁধ অতিক্রম করে, আবার কেউ সীমান্তের বেড়া টপকে স্প্যানিশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েন। এ সময় অন্তত ৬৭ জন নিহত হন। সীমান্তরক্ষীদের উপস্থিতি সত্ত্বেও এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রবেশ ঠেকানো যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আফ্রিকাসংলগ্ন এ বহিঃসীমান্ত আসলে কতটা সুরক্ষিত।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পেন সরকার সিউতার তারাহাল উপকূলে ৫০০ মিটার দীর্ঘ ভাসমান বাধা স্থাপন শুরু করেছে। পানির ওপর ৩০ থেকে ৭০ সেন্টিমিটার উঁচু এবং নিচের দিকে প্রায় এক মিটার বিস্তৃত এ বাধার পাশাপাশি নোঙর করা বয়াও বসানো হচ্ছে। স্পেনের সেনা ও পুলিশ সদস্যদেরও সীমান্তে মোতায়েন রাখা হয়েছে। অভিবাসীদের প্রবেশ প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। সরকারের আশঙ্কা, সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে গুজব ছড়ালে আবারো সীমান্তের দিকে মানুষের ঢল নামতে পারে।

অভিবাসীদের অধিকাংশ ফিরে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সিউতায় প্রবেশ করলেও তারা স্পেনের মূল ভূখণ্ড বা ইউরোপের অন্য দেশে যেতে পারেননি। সিউতা স্পেনের অংশ হলেও এখান থেকে মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার সময় পরিচয়পত্র, ভিসা ও পুলিশের অতিরিক্ত যাচাইয়ের মুখে পড়তে হয়। ফলে যারা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্য দেখে ইউরোপে সহজে প্রবেশের আশায় এসেছিলেন, তারা সিউতায় আটকা পড়েন। হাজার হাজার মানুষের জন্য শহরটিতে পর্যাপ্ত খাবার, আশ্রয় বা মৌলিক সেবার ব্যবস্থাও ছিল না। অনেককে রাস্তায় ও সমুদ্রসৈকতে রাত কাটাতে হয়। কয়েকজন অভিবাসী জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে এবং আশ্রয়হীন অবস্থায় থাকার পর তারা স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে ফিরে যাওয়ার এ দৃশ্য স্পেনের রাজনৈতিক চাপ কমাতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সমাজতান্ত্রিক সরকার ইউরোপের অন্য অনেক সরকারের তুলনায় অভিবাসন বিষয়ে অপেক্ষাকৃত উদার অবস্থান নিয়েছে। স্পেনে বসবাসরত পাঁচ লাখের বেশি অনথিভুক্ত অভিবাসীকে ধাপে ধাপে বৈধতা দেয়ার কর্মসূচিও নিয়েছে সরকার। বিরোধীদের অভিযোগ, এ ধরনের নীতি অভিবাসীদের কাছে ভুল বার্তা পাঠিয়েছে এবং স্পেনে প্রবেশ করলে শেষ পর্যন্ত বৈধতার সুযোগ পাওয়া যাবে—এমন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।

স্পেন সরকার অবশ্য এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের দাবি, মানব পাচারকারী চক্র ও সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায় বিকৃতভাবে প্রচার করেছে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে সিউতা বা মেলিলায় প্রবেশের সময় আটক ব্যক্তিদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করা হয় যেন সমুদ্রপথে একবার স্প্যানিশ ভূখণ্ডে পৌঁছতে পারলেই আর কাউকে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হবে না। বাস্তবে আদালত নিয়মিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের সুযোগ বহাল রেখেছেন।

সিউতার ঘটনা শেনজেন ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করেছে। ইতালি স্পেন থেকে আসা কিছু যাত্রীর ওপর এক মাসের জন্য অতিরিক্ত সীমান্ত পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিয়েছে। ফ্রান্স স্পেন সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ২২টি ইউরোপীয় দেশ জরুরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, সিউতায় প্রবেশকারীরা কোনোভাবে স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছতে পারলে ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারেন। ফলে একটি স্থানীয় সীমান্ত সংকট দ্রুত পুরো ইউরোপের অভ্যন্তরীণ চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

চাপ রয়েছে মরক্কোর ওপরও। বিশ্লেষকদের একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছেন, মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা শুরুতে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় ছিলেন কিনা। ২০২১ সালেও দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে প্রায় আট হাজার মানুষ সিউতায় প্রবেশ করেছিলেন। তখন স্পেন পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকামী নেতা ব্রাহিম ঘালিকে চিকিৎসার জন্য আশ্রয় দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল রাবাত। এবারো স্পেনের সঙ্গে আলজেরিয়ার সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সাহারাউইদের বংশধরদের নাগরিকত্ব দেয়ার উদ্যোগ মরক্কোকে অসন্তুষ্ট করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্পেন অবশ্য প্রকাশ্যে মরক্কোকে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবেই উল্লেখ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অধিকাংশ অভিবাসী ফিরে গেলেও সিউতার ঘটনা দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক হতাশা, বেকারত্ব, সামাজিক মাধ্যমের গুজব এবং দুর্বল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে মিললে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি বড় আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হতে পারে। তাই মানুষের ঢল থেমে গেলেও স্পেন ও ইউরোপের ওপর রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত ও কূটনৈতিক চাপ এখনো কাটেনি।