ইসরায়েলের একটি গুহায় প্রায় ১ লাখ বছর আগের এক প্রাচীন মানব সমাধির সন্ধান পেয়ে রীতিমতো চমকে গেছেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। এই আবিষ্কার মানব ইতিহাসে মৃত্যুর প্রতি প্রাচীন মানুষের মনোভাব এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে। খবর এপি।

ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে শোয়ামের কাছে টিনশেমেত গুহায় গবেষকরা বেশ কয়েকটি মানব কঙ্কাল অত্যন্ত যত্ন সহকারে সমাধিস্থ অবস্থায় পেয়েছেন। কঙ্কালগুলো প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ বছর আগের এবং এগুলো বিশেষভাবে ‘ভ্রূণ আকৃতিতে’ সমাধিস্থ করা হয়। এটি একধরনের প্রতীকী সমাধিস্থ করার ভঙ্গি।

এই সমাধিগুলোর পাশে পাওয়া গেছে বিভিন্ন বস্তুও। যেমন কালো পাথরের টুকরো, পশুর হাড় এবং লালচে রঙের ওখার খণ্ড, যেগুলোর দৈনন্দিন জীবনে বিশেষ ব্যবহার ছিল না। প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, এই বস্তুগুলো ব্যবহার করা হত মৃতদের স্মরণে আচার-অনুষ্ঠানে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রাচীন মানুষ কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক চর্চাও করত।

ইসরায়েলের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও খনন কাজের অন্যতম পরিচালক প্রফেসর ইওসি জাইডনার বলেন, ‘এটি আমাদের প্রজাতির জন্য সম্পূর্ণ এক নতুন ঘটনা। এই প্রথমবার আমরা এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি, যা আধ্যাত্মিক বা সামাজিক রীতি নির্দেশ করে।‘

২০১৬ সালে শুরু হয় এই খনন কাজ। এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে পাঁচটি প্রাচীন মানবদেহাবশেষ— যার মধ্যে দুটি পূর্ণাঙ্গ কঙ্কাল এবং তিনটি খণ্ডিত খুলি ও অন্যান্য হাড়। কঙ্কালগুলো এতটাই ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল যে, একটির হাতের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে জড়ানো অবস্থায় পাওয়া গেছে।

skul

টিনশেমেত গুহায় প্রাচীন মানবদেহাবশেষ। ছবি- এপি

গুহার আশপাশে প্রাকৃতিক পরিবেশ, যেমন অ্যাসিডযুক্ত চুনাপাথর, আগুনের ছাই এবং বৃষ্টিপাত— সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অসাধারণ সংরক্ষণের পরিবেশ। খননকারীরা গুহা থেকে ৫০০টিরও বেশি লাল ও কমলা রঙের ওখার টুকরো খুঁজে পেয়েছেন, যেগুলো আয়রনসমৃদ্ধ পাথর গরম করে তৈরি করা হত। এটি ইঙ্গিত দেয়, প্রাচীন মানুষ অলংকার বা দেহসজ্জার উপকরণ তৈরি করতে জানত।

টিনশেমেত গুহার ব্যাপারে প্রফেসর জাইডনারের ভাষ্য— এটি প্যালিওলিথিক যুগে মানব আচরণ ও বিবর্তন বোঝার জন্য পৃথিবীর তিন-চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর একটি। এই গুহা মধ্য প্যালিওলিথিক যুগের, যার সময়কাল আড়াই লাখ থেকে ৩০ হাজার বছর আগের মধ্যে।

ইসরায়েল ছিল ইউরোপ থেকে আগত নিয়ান্ডারথাল ও আফ্রিকা থেকে আগত হোমো স্যাপিয়েন্সের মিলনস্থল। এখানে পাওয়া মানবদেহগুলোর ডিএনএ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, তারা নিয়ান্ডারথাল, হোমো স্যাপিয়েন্স, অথবা একটি সংকরিত জনগোষ্ঠীর হতে পারে।

জাইডনার বলেন, এই সময়ে বিভিন্ন মানব গোষ্ঠীর মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটেছে— যা অলংকার, দেহরঞ্জন ও সমাধির মতো আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পেত।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক নৃতত্ত্ববিদ ও খনন সহ-পরিচালক ইসরায়েল হার্শকোভিটজ বলেন, ‘প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে সমাধির ধারণা একটি নিজস্ব এলাকা দাবি করার সূচনা হতে পারে। আমার পূর্বপুরুষ এখানেই শুয়ে আছেন— এভাবে মানুষ আশপাশের জনপদের কাছে জমির মালিকানা দাবি করত, যেমনটা আজও আমরা দেখি।‘