অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও দুই দেশের সম্পর্কে ‘নতুন যুগের কৌশলগত স্থিতিশীলতা’র কথা বলেছেন। সফরজুড়ে উষ্ণ কূটনীতি, জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা, পারস্পরিক প্রশংসা ও বৈঠকের ইতিবাচক বার্তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য চুক্তি, প্রযুক্তি সমঝোতা কিংবা ভূরাজনৈতিক অগ্রগতির ঘোষণা আসেনি। খবর সিএনএন ও বিবিসি।

ট্রাম্পের বেইজিং সফরটি ছিল নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় এক দশক পর দুই নেতার সরাসরি কয়েক দফা বৈঠক, ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা, তাইওয়ান সংকট, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর রফতানি নিয়ন্ত্রণ এবং চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ—সব মিলিয়ে সফরটিকে ঘিরে বৈশ্বিক আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক এতটাই তিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে উভয় পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের পুনরুদ্ধারকেই অনেক বিশ্লেষক বড় ঘটনা হিসেবে দেখছেন। যদিও সেটা শেষ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে আতিথেয়তায়।

বুধবার রাতে বেইজিং পৌঁছান ট্রাম্প। তাকে স্বাগত জানাতে ছিল সম্মাননা গার্ড, রাষ্ট্রীয় ভোজসভা এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় ক্ষমতার প্রতীক ঝংনানহাই প্রাঙ্গণে বিশেষ আমন্ত্রণ। ট্রাম্প নিজেও দৃশ্যত এ আয়োজনকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন। তিনি শি জিনপিংকে সেপ্টেম্বরে হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-ও নিশ্চিত করেছেন, শরতে শি ওয়াশিংটন সফর করবেন।

সফরের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দুই পক্ষের ঘোষণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরলেও মৌলিক বিরোধগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ট্রাম্প সফরের শুরুতে বলেছিলেন, ‘আমরা এমন অনেক সমস্যা সমাধান করেছি, যা অন্য কেউ পারত না।’ কিন্তু তিনি কী সমাধান করেছেন, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। বেইজিং ছাড়ার সময় এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি শুধু জানান, তাইওয়ান ও অস্ত্র বিক্রি নিয়ে শির সঙ্গে ‘খুব বিস্তারিত’ আলোচনা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এ বক্তব্যই সফরের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। কারণ উভয় পক্ষই এখন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলেও কেউই নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ছাড়তে প্রস্তুত নয়। বিশেষ করে তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিং এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছে। চীনা বিবরণীতে শি জিনপিং স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তাইওয়ান প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এটি ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত হতে পারে। অর্থাৎ বেইজিং একদিকে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের ‘রেড লাইন’ স্পষ্ট করে দিয়েছে।

এ সফরে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা ছিল বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সমঝোতা নিয়ে। ট্রাম্প সফরের আগে দাবি করেছিলেন, তিনি বিশাল বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ফিরবেন। সফরে তার সঙ্গে ছিলেন বোয়িং, টেসলা, এনভিডিয়া ও কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট শীর্ষ নির্বাহীরা। কিন্তু সেখানেও কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হয়নি দুদেশের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, চীন আগামী তিন বছরে প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি কৃষিপণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প নিজেও দাবি করেন, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে এবং আরো ৭৫০টি বিমানের সম্ভাব্য অর্ডার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সফরের সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে এখানেই। কারণ চীনের পক্ষ থেকে এসব চুক্তির কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ আসেনি। বেইজিং শুধু বলেছে, দুই দেশ অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও বাণিজ্যে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি, অর্ডার বা ক্রয়ের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি বোয়িংও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন কেবল বলেছেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি পারস্পরিক লাভ ও জয়-জয় সহযোগিতা। তিনি দুই দেশের নেতাদের মধ্যে হওয়া ‘গুরুত্বপূর্ণ ঐকমত্য’ বাস্তবায়নের কথা বললেও কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির কথা উল্লেখ করেননি। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, দুই নেতা ‘বোর্ড অব ট্রেড’ নামে একটি কাঠামো তৈরিতে সম্মত হয়েছেন, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা করা হবে। তবে এটিও এখনো ধারণাগত পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, বিনিয়োগ সহায়তা ব্যবস্থার বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হতে পারে, কিন্তু তা কার্যকর করতে এখনো অনেক কাজ বাকি।

এ সফরের আরেকটি বড় প্রেক্ষাপট ছিল ইরান যুদ্ধ। ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা ছিল, তেহরানের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে চীন হয়তো ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে, যাতে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং জ্বালানি সংকট কমানো যায়। কিন্তু বৈঠকের পর কোনো বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি। ট্রাম্প শুধু বলেছেন, শি সাহায্য করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং ইরানকে সামরিক সহায়তা না দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পরে জানান, যুক্তরাষ্ট্র আসলে চীনের কাছে ইরান ইস্যুতে সরাসরি সহায়তা চায়নি।

চীনও তাদের পুরনো অবস্থানেই থেকেছে। বিবৃতিতে বেইজিং বলেছে, যুদ্ধ হওয়াই উচিত ছিল না এবং দ্রুত যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা উচিত। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে কোনো চাপ প্রয়োগ বা অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়ে কিছু বলেনি বেইজিং। ফলে সফরের শুরুতে যেভাবে ধারণা করা হচ্ছিল যে ট্রাম্প-শি বৈঠক মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নতুন মোড় আনতে পারে, বাস্তবে তেমন কিছু ঘটেনি।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও বড় প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াং এবং টেসলা প্রধান ইলোন মাস্ক সফরে উপস্থিত থাকায় ধারণা করা হচ্ছিল, এআই চিপ রফতানি, সেমিকন্ডাক্টর প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হয়তো বড় কোনো সমঝোতা হবে। কিন্তু সেখানেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কূটনৈতিক পরিবেশ। বেইজিং ট্রাম্পকে যেভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে সামরিক কুচকাওয়াজ, শিশুদের পতাকা নাড়ানো, রাষ্ট্রীয় ভোজ, টেম্পল অব হেভেন সফর এবং শেষ দিন গতকাল ঝংনানহাই কমপ্লেক্সে বিশেষ আমন্ত্রণ সবকিছুই ছিল সম্পর্ক স্থিতিশীলতার প্রতীকী বার্তা।

বিশেষ করে ঝংনানহাই সফরকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির এ গোপন কমপ্লেক্সে খুব কম বিদেশী নেতাকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়। একসময় এটি ছিল সম্রাটদের উদ্যান এলাকা। সেখানে ট্রাম্পকে নিয়ে গিয়ে শি জিনপিং মূলত দেখাতে চেয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী।

ট্রাম্পও সফরজুড়ে শি জিনপিংয়ের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তিনি পুরোপুরি ব্যবসাবান্ধব মানুষ। কোনো খেলা নেই, আবেগী কথাবার্তা নেই। আমি সেটা পছন্দ করি।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা হলো সফরটি সম্পর্কের উত্তেজনা কমালেও বিরোধের সমাধান করতে পারেনি, প্রত্যাশিত কোনো চুক্তিও হয়নি।