হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বৈশ্বিক সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের আশঙ্কা, জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হলে এসব জাহাজের গায়ে জন্ম নেয়া আগ্রাসী সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদ বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের পর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে দেড় হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় স্থির অবস্থায় থাকায় জাহাজগুলোর তলদেশে শৈবাল, অণুজীব, বার্নাকল, ঝিনুক ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীর ঘন আবাস গড়ে উঠেছে।

গবেষণা প্রধান এবং ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক মারিও ট্যাম্বুরি বলেন, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি কল্পনা করলেও হবে না। আমরা যা চিন্তা করব, তার চেয়েও খারাপ হতে পারে পরিস্থিতি।

গবেষণায় এ ঘটনাকে সম্ভাব্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য আগ্রাসনের সুপার-স্প্রেডার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের ভাষ্য, অতীতে এত বিপুলসংখ্যক জাহাজ কখনো এত দীর্ঘ সময় এক জায়গায় স্থির অবস্থায় থাকেনি।

সাধারণত কোনো জাহাজ বন্দরে এক থেকে তিন দিনের বেশি নোঙর করে না। ফলে এর গায়ে সামুদ্রিক জীবের বিস্তার সীমিত থাকে। কিন্তু উপসাগরে আটকে থাকা বহু জাহাজ কয়েক মাস ধরে একই স্থানে থাকায় সেখানে ঘন সামুদ্রিক জীবসম্প্রদায় গড়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব জাহাজ পুনরায় যাত্রা শুরু করলে বার্নাকল, শৈবাল, ঝিনুকসহ বিভিন্ন জীব বিশ্বের নানা বন্দরে পৌঁছে স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে, রোগ ছড়াতে পারে এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।

ট্যাম্বুরি বলেন, আগ্রাসী প্রজাতি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে পারে, এমনকি কিছু দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তির কারণও হতে পারে। পাশাপাশি এসব জীব মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কুলিং সিস্টেমে বাধা সৃষ্টি এবং নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণ হতে পারে।

গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চ তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সেখানে বেড়ে ওঠা জীবগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি সহনশীল। ফলে তারা নতুন পরিবেশেও সহজে টিকে থাকতে পারে। বিশেষ করে ভারত, সিঙ্গাপুরসহ একই ধরনের উষ্ণ ও লবণাক্ত সামুদ্রিক পরিবেশের বন্দরগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় নোঙর করে থাকার ফলে জাহাজগুলোর ব্যালাস্ট, পানি ও তলদেশে থাকা জীবাণু, পরজীবী এবং অন্যান্য জীবও বৈশ্বিক নৌপরিবহণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপসাগর ছাড়ার আগে জাহাজগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা ও পরিষ্কার করার পাশাপাশি সম্ভাব্য গন্তব্য বন্দরে আগ্রাসী প্রজাতি শনাক্তে নজরদারি জোরদার এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকরা।

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, জাহাজের গায়ে জমে থাকা সামুদ্রিক জীব আগ্রাসী জলজ প্রজাতি ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এ ঝুঁকি কমাতে জাহাজ পরিচালনাকারীদের আইএমওর বায়োফাউলিং নির্দেশিকা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক বিধিমালা তৈরির কাজও চলছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে প্রবালপ্রাচীর, সি-গ্রাসের তৃণভূমি ও ঝিনুকের আবাসস্থলের মতো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। মানবিক সংকটের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।