অভিবাসী সংকটকে কেন্দ্র করে স্পেন ও ইতালির মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। এর জেরে ইতালির থেকে আকাশ ও নৌপথে প্রবেশের ক্ষেত্রে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে স্পেন। খবর বিবিসি।
মাদ্রিদ সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, ইতালি থেকে আকাশ ও নৌপথে স্পেনে আসা সব যাত্রী ও দর্শনার্থীর ওপর এ কড়াকড়ি বলবৎ থাকবে। শুক্রবার মধ্যরাতে কার্যকর হওয়া এ কড়াকড়ি আগামী এক মাস বহাল থাকবে। এক সপ্তাহ আগে প্রায় ৭৮ হাজার অভিবাসী মরক্কো থেকে সেউতায় প্রবেশের পর একই ধরনের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ চালু করেছিল ইতালি।
ঘটনার শুরু স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় মরক্কো থেকে প্রায় ৭৮ হাজার অভিবাসীর আকস্মিক প্রবেশকে কেন্দ্র করে। এর পরপরই নিরাপত্তার অজুহাতে স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের ওপর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ইতালি।
স্পেন শুক্রবার ইতালিকে আগামী রোববারের মধ্যে এ কড়াকড়ি তুলে নেয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছিল। তবে রোম তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, তারা কোনো ‘চূড়ান্ত নির্দেশ’ মেনে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না। তাদের দাবি, স্পেনে প্রবেশ করা অভিবাসীদের কেউ যাতে পরবর্তী সময়ে ইতালিতে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই সাময়িকভাবে শেনজেন চুক্তির আওতায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে। অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
স্পেনের সরকার অবশ্য ইতালির এ অবস্থানকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মাদ্রিদের যুক্তি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের শেনজেন এলাকায় প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। ফলে তাদের কারণে ইতালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরির দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এ সংকটের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুই শীর্ষ নেতৃত্ব—স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইতালির কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির রাজনৈতিক অবস্থানগত দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এলো। দীর্ঘদিন ধরেই ইইউর অভিবাসন নীতি আরো কঠোর করার পক্ষে জোরালো দাবি জানিয়ে আসছেন মেলোনি।
রোমের দাবি, সাধারণ স্প্যানিশ ও ইইউ নাগরিকদের যাতায়াত সহজ রাখতে এরই মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে রোম ও মিলানের বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘ সারি ও চরম ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মাদ্রিদ জানিয়েছে, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইতালি থেকে আগত যাত্রীদের পাসপোর্ট, জাতীয়তা ও ভিসা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন না হলে এ সময়সীমা আরো বাড়তে পারে।
সীমান্ত কড়াকড়ি আরোপের এ ঘটনা ইইউতে নতুন নয়। ইতালি বর্তমানে স্লোভেনিয়া সীমান্তেও একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। রোমের এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্র উল্টো স্পেনের শেনজেন সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
সেউতায় গত সপ্তাহে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশ করলেও তাদের বেশিরভাগকেই কয়েক দিনের মধ্যে ফেরত পাঠানো হয়। তবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ অপ্রাপ্তবয়স্ক এখনো সেউতায় অবস্থান করছে।
মরক্কো থেকে নতুন করে আরেকটি বড় ঢল সেউতায় আসতে পারে এমন আশঙ্কা ছড়ালেও স্পেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় দফা অভিবাসী প্রবেশের কোনো পূর্বাভাস দেয়নি। স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং গত সপ্তাহের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তারা করছে না।
সেউতায় এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন একযোগে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল, তার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনার দাবি করেছেন, অপরাধী চক্রের ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। স্পেন সরকারও এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছে।
এর আগে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, সেউতা বা মেলিলায় যাওয়ার সময় সমুদ্র থেকে আটক অভিবাসীদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। এরপর থেকেই অভিবাসীদের মধ্যে সেউতায় প্রবেশের প্রবণতা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মরক্কো অবশ্য এ সংকটের জন্য স্পেনের আদালতের সিদ্ধান্তকেই দায়ী করেছে। দেশটির এক সরকারি সূত্রের দাবি, আদালতের রায়ের কারণে অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করার ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এদিকে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সাঁতরে সেউতায় প্রবেশের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, কেন মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা তাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করেনি।
স্পেন ও ইতালির পাল্টাপাল্টি সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ইউরোপের শেনজেন এলাকার অবাধ চলাচল ব্যবস্থাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। অভিবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিরোধ আগামী দিনগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।










