এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা গেল স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সিউতায়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মরক্কো থেকে সাঁতরে, সীমান্তের বেড়া টপকে ও উপকূলীয় পথ ধরে সেখানে ঢুকে পড়লেন প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী। এ সংখ্যা ছোট্ট শহরটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশের সমান। আকস্মিক এ জনস্রোতে সীমান্তে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পানিতে ডুবে এবং হুড়োহুড়ির মধ্যে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান অন্তত ৬০ জন। কিন্তু কেন হঠাৎ হাজার হাজার মানুষ একযোগে সিউতার দিকে ছুটলেন?
স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের দাবি, দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের ভুল ব্যাখ্যা মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়াই এ নজিরবিহীন অভিবাসী ঢলের প্রধান কারণ। সিউতা ও মাদ্রিদের কর্তৃপক্ষ বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কগুলো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেয়। ওই রায়ে বলা হয়, সমুদ্রপথে সিউতা বা মেলিয়ায় পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমকারী কিংবা সীমান্তের বেড়া টপকে প্রবেশকারীদের ক্ষেত্রে আগের নিয়মই বহাল রয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানিয়েছেন, সম্প্রতি স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে সমুদ্রপথে সিউতা বা মেলিয়ায় পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। মানবপাচারকারী চক্র এই রায়কে বিকৃতভাবে প্রচার করে অনেককে বোঝায় যে সাগর পেরিয়ে সিউতায় পৌঁছাতে পারলেই ইউরোপে থাকার সুযোগ মিলবে। এই গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পাচারকারীদের নেটওয়ার্কে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরই সীমান্তে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘মনে হচ্ছে, গত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কগুলো সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়। এর ফলেই গতকাল আমরা যে গণঅনুপ্রবেশ দেখেছি, তা ঘটেছে।’
তবে মরক্কোর কয়েকজন অভিবাসী অধিকারকর্মী এ ব্যাখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সীমান্তে জড়ো হওয়া অধিকাংশ অভিবাসীরই স্পেনের আদালতের এমন একটি আইনি সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানার কথা নয়। ফলে শুধু আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যাকেই এ ঢলের জন্য দায়ী করা যৌক্তিক নয়।
সিউতায় প্রবেশ করা অনেক তরুণ জানিয়েছেন, মরক্কোয় বেকারত্ব, কম মজুরি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেতেই তারা স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ইউরোপে কাজ ও উন্নত জীবনের সুযোগ পাওয়ার প্রত্যাশাও বিপুলসংখ্যক মানুষকে সীমান্তের দিকে টেনে এনেছে।
শহরটির প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস জানিয়েছেন, মরক্কো থেকে সিউতায় গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসী প্রবেশ করেছেন। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য প্রবেশকারীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার বলে জানিয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৬০ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের কেউ মরক্কো থেকে সাঁতরে সিউতায় যাওয়ার সময় ডুবে মারা গেছেন। আবার কেউ সীমান্তের বেড়া ও ব্রেকওয়াটার অতিক্রম করতে গিয়ে সৃষ্ট হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়েছেন।
আকস্মিক এ অভিবাসী ঢলে সিউতায় তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়। শহরটির পার্ক, ফুটপাত ও খোলা জায়গায় হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে অভিভাবকহীন শিশুও রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও আশ্রয় না পাওয়ায় অনেকেই পরে মরক্কোয় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
স্প্যানিশ সরকার জানিয়েছে, সিউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের প্রায় অর্ধেক এরই মধ্যে স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে গেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিউতায় অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করেছে স্পেন। অন্যদিকে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্তে জড়ো হওয়া অভিবাসীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস, লাঠি ও জলকামান ব্যবহার করেছে। কয়েকটি স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে অভিবাসীদের সংঘর্ষও হয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সিউতা সফর করে এ ঘটনাকে দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সিউতার পরিস্থিতি ইউরোপের অন্যান্য দেশেও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি দেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তির সুবিধা স্থগিত করার হুমকি দিয়েছেন। যদিও ইতালির সঙ্গে স্পেনের কোনো স্থলসীমান্ত নেই এবং ইতালিও ভূমধ্যসাগর হয়ে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশপথ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, সিউতার সংকটের পর স্পেন সীমান্তে তল্লাশি আরো জোরদার করবে ফ্রান্স। ইতালির সমালোচনার পর বৃহস্পতিবার রাতে এক বিবৃতিতে স্পেন সরকার জানায়, ‘সিউতার এ সংকটের সঙ্গে সরকারের অভিবাসী বৈধকরণ কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই। কিছু পক্ষ যে দাবি করছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য।’
স্পেনের সরকার বলছে, নিয়মিত ও বৈধ অভিবাসনের বিষয়ে তাদের অবস্থান ইতিবাচক হলেও অনিয়মিত সীমান্ত অতিক্রমের ক্ষেত্রে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী নেটওয়ার্কগুলোর বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বন্ধে ইউরোপীয় ও মরক্কোর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।










