নিজেদের পণ্য ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা কয়েক লাখ ব্যবহারকারীর ভিডিও নজরে আসার পর ব্র্যান্ডটি নিজেদের কৌশল বদলায়। দর্শকের তৈরি সে কনটেন্টকে কেন্দ্র করেই কোম্পানিটি ৪৫০ জন ইনফ্লুয়েন্সারের সমন্বয়ে শুরু করে ‘ভ্যাজলিন ভেরিফায়েড’ নামে এক প্রচারণা।

ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে কোম্পানিটি সাধারণ সমস্যা সমাধান থেকে শুরু করে চামড়ার তৈরি শখের পণ্য নরম করার মতো কাজে ভ্যাজলিনের উপযোগিতা তুলে ধরে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি বাজারে। প্রচারণাটি সামাজিক মাধ্যমে কোটি কোটি ভিউ পায়, সেই সঙ্গে বিক্রিতেও দেখা যায় উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যবহারকারীর তৈরি কনটেন্ট (ইউজার জেনারেটেড কনটেন্ট) কাজে লাগিয়ে ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা তৈরি ও বিক্রি বাড়ানোর এ কৌশল এখন বিশ্বব্যাপী কোম্পানিগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন্ড হয়ে উঠছে।

বর্তমানে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং আর কেবল শখের বিষয় নয়, এটি এখন ভোগ্যপণ্য বা কনজিউমার ব্র্যান্ডগুলোর জন্য বিপণন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, গত বছর ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং খাতের বাজারমূল্য ছিল ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি।

স্যামসাং ইউরোপের চিফ মার্কেটিং অফিসার বেঞ্জামিন ব্রাউনের মতে, ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ ও ব্র্যান্ডের উপস্থিতি জোরদারে সামাজিক মাধ্যমই এখন সবচেয়ে কার্যকর প্লাটফর্ম। বিজ্ঞাপনের সনাতন রূপ এখন মানুষের কাছে কিছুটা একঘেয়ে।

বেঞ্জামিন ব্রাউন বলেন, ‘আমি যদি ব্র্যান্ডের পক্ষ থেকে আপনাকে সরাসরি কিছু বলি, আপনি খুব বেশি সময় ধরে তা শুনবেন না। কিন্তু আপনি যাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলো করেন, তাদের কথা আপনি অনেক সময় ধরে শোনেন।’

অর্থাৎ এখানে দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বা ‘ডুয়াল টাইম’ অনেক বেশি।

তিনি আরো জানান, বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করছে। উদাহরণ হিসেবে ডেটলের কথা বলা যায়। করোনা মহামারীর সময় কোম্পানিটি ভারতে ‘#HandWashChallenge’ শুরু করেছিল। এ প্রচারণায় কোম্পানিটি নামকরা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সেলিব্রিটিদের সঙ্গে কাজ করেছে। ধীরে ধীরে এতে সাধারণ মানুষও যোগ দেয় এবং প্রায় সাড়ে ৭ কোটি ভিডিও তৈরি হয়।

ডেটলের প্যারেন্ট কোম্পানি রেকিটের কর্মকর্তা রায়ান ডুলিয়া জানান, শুরুতে বড় তারকারা প্রচার শুরু করলেও পরে মাঝারি মানের ইনফ্লুয়েন্সার ও সাধারণ মানুষ এতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়।

বিজ্ঞাপন সংস্থা ওজিলভির কর্মকর্তা ইমোজেন কোলসের মতে, আগে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং ছিল কেবল পিআর বা জনসংযোগের অংশ। কিন্তু এখন এটি সরাসরি পেইড মিডিয়া বা মূল বিজ্ঞাপনী বাজেটের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এ পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। যেমন আগে বিজ্ঞাপনদাতারা নিজেরা ঠিক করে দিতেন বিজ্ঞাপনের প্রতিটি শব্দ ও দৃশ্য কী বা কেমন হবে। এখন আর তা সম্ভব নয়। ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে মিলে কনটেন্ট তৈরি বা ‘কো-ক্রিয়েশন’ করতে হয়। নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে না দিলে এ বিজ্ঞাপন কাজ করে না।

তিনি আরো যোগ করেন, ব্র্যান্ডগুলোকে এখন শুধু বড় তারকা নয়, বরং ন্যানো ইনফ্লুয়েন্সারদের (যাদের ১০ হাজারের কম ফলোয়ার আছে) সঙ্গেও কাজ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে কার জনপ্রিয়তা কখন বাড়ে বা কমে, তা বলা কঠিন। এছাড়া টিভি বিজ্ঞাপনে কত অর্থ খরচ করে কত মুনাফা হলো, তা সহজে বোঝা যায়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিউ দেখেই সফলতার বিচার করা যায় না।

তবে সফল হলে এ খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন বা আরওআই সাধারণ বিজ্ঞাপনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি হতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুবিধার পাশাপাশি ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ে ঝুঁকিও প্রবল। যদি কোনো প্রচারণায় ভুল হয়, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব ব্র্যান্ডের ওপর খুব দ্রুত পড়ে। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কারণে অনেক বড় ব্র্যান্ডকে লোকসানে পড়তে হয়।

ওজিলভির কর্মকর্তা ইমোজেন আরো জানান, সোশ্যাল মিডিয়া এমন জায়গা, যেখানে মাত্র এক হাজার ফলোয়ার নিয়েও কেউ রাতারাতি ভাইরাল বা জনপ্রিয় হতে পারে। তাই কাউকে এখানে বড় বা ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সঠিক পরিকল্পনা ও কঠোর পরিচালনা ছাড়া আধুনিক বিপণন ব্যবস্থাটি যেকোনো সময় মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।

—বিবিসি অবলম্বনে