হিন্দিভাষী উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বে প্রভাব বিস্তারে বিজেপি একের পর এক সাফল্য পেয়ে এসেছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধে দৃঢ়চেতা হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ এতদিন নাগালের বাইরে ছিল। অবশেষে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে এককভাবে সরকার গঠনের পথে রয়েছে বিজেপি। গতকাল ভোট গণনার পর বেসরকারি ফলাফলে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেকটাই নিশ্চিত।
একই দিন ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বড় ধরনের রাজনৈতিক পালাবদল দেখা গেছে। তামিলনাড়ুতে মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্টালিনের নেতৃত্বাধীন দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগমের (ডিএমকে) নেতৃত্বাধীন জোট সরকারকে পরাজিত করে অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বিজয় থালাপাতির নতুন দল তামিলাগা ভেত্রি কাজগম (টিভিকে) ক্ষমতায় আসার পথে রয়েছে। অন্যদিকে কেরালায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) পরপর দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (এলডিএফ) পরাজিত করে ভারতের শেষ কমিউনিস্ট নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের অবসান ঘটানোর পথে। তবে আসামে বিজেপি নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতেও দলটি নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
এসব পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল পশ্চিমবঙ্গে। গত অর্ধশতকে রাজ্যটিতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে মাত্র একবার। প্রথমে ৩৪ বছর শাসন করেছে বামফ্রন্ট, এরপর ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল কংগ্রেস, যার নেতৃত্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গকে এমন রাজ্য হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন, যেখানে ‘প্রভাবশালী একক দল’ বা হেজেমনিক রাজনীতির প্রবণতা প্রবল।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভায় মোট আসন ২৯৪টি। এনডিটিভির খবর অনুযায়ী বেসরকারি ফলাফলে বিজেপি জিতেছে ২ শতাধিক আসনে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস জিতেছে ৮১টি আসনে। এছাড়া বামপন্থী জোট ও কংগ্রেস জিতেছে দুটি করে আসনে।
ফলাফল বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে। ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং সুশাসনের রাজনীতি বিজয়ী হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মানুষকে আমি শ্রদ্ধাভরে প্রণাম জানাই। জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমি তাদের আশ্বস্ত করছি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে আমাদের দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। আমরা এমন একটি সরকার গঠন করব, যা সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের জন্য সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।’
এমনকি নিজের আসন ভবানীপুরেও বিজেপি নেতা ও বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিপক্ষে হেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে বিজেপির বিরুদ্ধে ফলাফল লুটের অভিযোগ এনেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। গতকাল মমতা সাংবাদিকদের বলেন, ‘১০০টির বেশি আসন বিজেপি লুট করেছে। নির্বাচন কমিশন এখন বিজেপির কমিশনে পরিণত হয়েছে। আমি প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছি, কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এটিকে কি আপনারা বিজয় বলবেন? এটি নৈতিক বিজয় নয়, অনৈতিক বিজয়। নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমন্বয়ে যা করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। এটি শুধু লুট, লুট, লুট। আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াব।’
দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে নাটকীয় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর আধিপত্য ভেঙে এগিয়ে এসেছে নতুন শক্তি। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা বিজয় থালাপাতির দল টিভিকে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দলটি ১০৭টি আসনে জিতেছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী দল ডিএমকে জিতেছে ৭৪ আসনে। একইভাবে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজগম (এআইএডিএমকে) জোট ৫২টি আসনে জয় পেয়েছে। এ ফলাফল তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারাকে ভেঙে দিয়েছে। ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মধ্যকার পালাবদলের রাজনীতির জায়গায় এখন তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিভিকের উত্থান স্পষ্ট।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের বিধানসভা নির্বাচনে একতরফা জয় পেয়েছে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট। প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ১২৬ আসনের এ রাজ্যে বিজেপি জোট ১০১টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ২১ আসন পেয়েছে। অন্যান্য দল মিলিয়ে মাত্র তিনটি আসনে জয় পেয়েছে। এ ফলাফল আসামে বিজেপির শক্ত অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করেছে।
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়ে বড় জয় পেয়েছে ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। ১৪০ আসনের মধ্যে ৮৯টিতে জয় পেয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। পরপর দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকা বাম জোট লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) পেয়েছে ৩৫টি আসন। একই সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি নেতৃত্বাধীন জোট তিনটি আসনে জয় পেয়েছে।
ভারতের কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল পুদুচেরির বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি নেতৃত্বাধীন জোট। বেসরকারি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, ৩০ আসনের এ পরিষদে বিজেপি জোট ১৮টি আসনে জয় পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ছয়টি আসন পেয়েছে। একই-সংখ্যক আসন পেয়েছে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।










