ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের নামে নতুন এক বিতর্কিত ধারণা সামনে এসেছে। প্রাকৃতিক ‘বাধা; হিসেবে সীমান্তে কুমির ও বিষধর সাপ ছেড়ে দেয়া। সীমান্তের যেসব অংশে কাঁটাতারের বেড়া বসানো কঠিন, বিশেষ করে নদী ও জলাভূমি অঞ্চল, সেখানে এই শিকারি প্রাণীগুলো ছেড়ে দিয়ে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান ঠেকানোর সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) অভ্যন্তরীণভাবে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর মানবাধিকারকর্মী, পরিবেশবিদ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। এটা বিপজ্জনক ও অমানবিক কৌশল কিনা সে বিতর্কও উঠেছে। খবর আল জাজিরা।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত। এই সীমান্তের বড় অংশই পাহাড়ি, নদীবহুল বা জলাভূমি অঞ্চল। যেখানে প্রচলিত কাঁটাতারের বেড়া বসানো জটিল। ভারত ইতোমধ্যে প্রায় ৩,০০০ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করেছে। তবে নদী ও চরাঞ্চল সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো স্থাপন কার্যত কঠিন।

এ প্রেক্ষাপটে মার্চ মাসে বিএসএফের এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটগুলোকে সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কুমির ও বিষধর সাপ ব্যবহার করে ‘প্রাকৃতিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলা যায় কি না তা খতিয়ে দেখতে হবে। বিষয়টি প্রথমে আঞ্চলিক একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, পরে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনায় আসে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ বলছেন, সীমান্তে কুমির বা সাপ ছেড়ে দেওয়া বাস্তবে কোনো কার্যকর সমাধান নয়। প্রথমত, এই প্রাণীগুলো মানুষ বা জাতীয়তা চিহ্নিত করতে পারে না। তারা বাংলাদেশী বা ভারতীয় চেনে না। ফলে এটি সীমান্ত সুরক্ষার বদলে উভয় দেশের সীমান্তবর্তী সাধারণ মানুষের জন্য সমান ঝুঁকি তৈরি করবে। দ্বিতীয়ত, নদী একটি চলমান ও উন্মুক্ত পরিবেশ এখানে প্রাণীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। তারা ভেসে যেতে পারে, অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি বসতিতে ঢুকে পড়তে পারে।

ভারতের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মান্দার বলেছেন, এই নীতি ভারতীয় রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতাকেই প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর বদলে ভারত বিচারবহির্ভূত পদ্ধতি বেছে নিচ্ছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্ত বিষয়ক গবেষক অংশুমান চৌধুরী বলেছেন, এটা হাস্যকর হতো, যদি না এটা এতটা ভয়ঙ্কর এবং বিপজ্জনক হতো। একবার বিষধর সাপ এবং কুমির ছেড়ে দিলে, তারা কিন্তু বাছাই করতে পারবে না—এটা বাংলাদেশী না ভারতীয়। তিনি এ পরিকল্পনাকে বায়োপলিটিক্যাল ভায়োলেন্স-এর এক নতুন রূপ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এটি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে প্রকৃতি ও প্রাণীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার একটি অভূতপূর্ব নজির।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এ পরিকল্পনা শুধু মানুষের জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও বিপজ্জনক। কুমির বা নির্দিষ্ট প্রজাতির বিষধর সাপ সীমান্তের সব নদীতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না। উদাহরণ হিসেবে সুন্দরবনে কুমির থাকলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক নদীতে তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান নেই। সেখানকার পরিবেশে কুমির ছেড়ে দিলে তারা টিকে থাকতে নাও পারে। একইভাবে সাপের ক্ষেত্রেও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে।

ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার কৌশল ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান রাথিন বর্মন বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নদী এলাকায় কুমির মোটেই স্বাভাবিক প্রাণী নয়। কুমিরের এক প্রজাতি সুন্দরবনে এবং আরেক প্রজাতি আসামের সংরক্ষিত জলাভূমিতে পাওয়া যায়, কিন্তু সীমান্ত এলাকায় নয়।

তিনি সতর্ক করেন, সীমান্তে কুমির ছেড়ে দিলে তারা হয়তো টিকেই থাকতে পারবে না। তিনি বলেন, প্রথম কথা হলো, এরা দ্রুতই মারা যাবে। বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যেকোনো প্রজাতিকে তার স্বাভাবিক বিচরণ এলাকার বাইরে নিয়ে যাওয়া পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। যদি এটা করা হয়, তাহলে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল বা বাস্তুতন্ত্রে হস্তক্ষেপ হতে পারে।

বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আন্তর্জাতিক সীমান্ত রক্ষায় শিকারি প্রাণী ব্যবহারের নজির নেই। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে একসময় সীমান্তে ‘মোট’ তৈরি করে তাতে সাপ বা অ্যালিগেটর রাখার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে জানা যায়, সেটি বাস্তবে রূপ পায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বিতর্কিত অভিবাসন আটক কেন্দ্রের অবস্থান জলাভূমির কাছে হওয়ায় সেটিকে ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’ নামে ডাকা হয়, কিন্তু সেটিও সরাসরি প্রাণী ব্যবহার করে সীমান্ত রক্ষা নয় বরং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এমন নাম।

সব মিলিয়ে, কুমির ও সাপ ব্যবহার করে সীমান্ত ‘বেষ্টনী’ তৈরির ধারণাটি যতটা অস্বাভাবিক, ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ। এটি প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার একটি ‘সহজ’ সমাধান হিসেবে সামনে এলেও বাস্তবে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করতে পারে।