ইরানে আপাতত নতুন কোনো সামরিক হামলা না চালাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা মার্কিন হামলা বন্ধে শুক্রবার দেয়া ট্রাম্পের এ নির্দেশনার পেছনে যুদ্ধরত দুই দেশের মধ্যে কূটনীতিক তৎপরতার গতি বৃদ্ধি, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র মজুতে টান পড়া এবং সংঘাত ব্যাপক রূপ নেয়ার আশঙ্কার মতো বিষয়গুলোর প্রভাব রয়েছে বলে মার্কিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, টানা ১৩ দিন ধরে চলা ধারাবাহিক অভিযানের পর ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে দুটি প্রধান বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—প্রথমত, তেহরানের সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত রাখা এবং দ্বিতীয়ত, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে না জড়িয়ে কেবল ধারাবাহিক বিমান হামলায় লক্ষ্য অর্জনের সীমা যে শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে, সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করা।

একাধিক সূত্রের বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস বলছে, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে ওয়াশিংটন এখনই পিছু হটছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, প্রেসিডেন্ট নতুন নির্দেশ দিলেই মার্কিন সামরিক বাহিনী আবারো পূর্ণ শক্তিতে আঘাত হানতে প্রস্তুত রয়েছে। এর জন্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানের খসড়া পরিকল্পনাও সাজিয়ে রেখেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনী। যদিও হোয়াইট হাউস থেকে এখনও সে ধরনের কোনো চূড়ান্ত আদেশ আসেনি। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্যও পাওয়া যায়নি।

অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রতিদিন বিকালে তাদের প্রস্তুত করা হামলার পরিকল্পনা প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠাত এবং ট্রাম্প তাতে অনুমোদন দিতেন। অনুমোদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিচালিত হতো অভিযান। তবে শুক্রবার একই ধরনের সামরিক পরিকল্পনা জমা দেয়া হলেও এতে অনুমোদন দেননি ট্রাম্প। বরং সামরিক বাহিনীকে নতুন কোনো হামলা না চালিয়ে অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ দেন তিনি।

এ সিদ্ধান্তের পরপরই হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প জানান, হামলা চালিয়ে যাওয়া কিংবা ইরানের সার্বিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেয়ার মতো চরম পদক্ষেপের বিকল্প তার হাতে এখনো রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তি করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কৌশল হবে বলে মনে করেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, আমরা এ মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছি। দিন যত যাচ্ছে, তারা আলোচনা নিয়ে আগের চেয়ে বেশি আন্তরিক হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। আমাদের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় (লকড অ্যান্ড লোডেড) রয়েছে, তবে আমরা আপাতত আলোচনার পথকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

তবে একই দিন রাতে 'হোয়াইট হাউস করসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন'-এর বার্ষিক নৈশভোজে দেয়া বক্তব্যে ট্রাম্পের গলায় খানিকটা ভিন্ন সুরও শোনা যায়। তিনি মন্তব্য করেন, ইরান হয়তো এখনই কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত নয়, তবে ওয়াশিংটন আলোচনার দরজা খোলা রাখতে রাজি।

এদিকে পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের এ আকস্মিক সিদ্ধান্তে বেশ অনিশ্চয়তায় পড়েছে তেল আবিব। ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ধারণা ছিল, শুক্রবার মার্কিন বাহিনীর পক্ষে থেকে আরো বড় ধরনের হামলা চালানো হবে। ওয়াশিংটনের সেই সম্ভাব্য ব্যাপক হামলার জেরে ইরান সরাসরি ইসরায়েলে পাল্টা প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে পারে—এমন শঙ্কায় সর্বোচ্চ সামরিক সতর্কতায় রাখা হয়েছিল ইসরায়েলি বাহিনীকে।

ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের অভিযোগ, ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশল নিয়ে তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। পরে শুক্রবার রাতে ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, ট্রাম্প নতুন কোনো হামলায় সম্মতি দেননি।

অ্যাক্সিওস বলছে, কূটনৈতিক অঙ্গনে এ ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্যে মূল ভূমিকা রাখছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে শুক্রবার ওমানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছায়। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্পের পক্ষ থেকে হামলা বন্ধের নির্দেশনা আসে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দুটি কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ওমান ও ইরানের মধ্যকার মধ্যস্থতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সব ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহের শেষভাগে দুই দেশের মধ্যে নতুন সমঝোতা চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে। তেহরান ও ওমানের মধ্যস্থতাকারীদের সেই প্রস্তাবিত চুক্তি ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করবে কি না, এখন তা নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।