সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে বড় ধরনের ভরাডুবির পর দলটির তিনজন মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং ৮০ জনের বেশি লেবার আইনপ্রণেতার প্রকাশ্য অসন্তোষে চাপে পড়েছেন তিনি। বিদ্রোহী এমপিরা স্টারমারের ক্ষমতা ছাড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তবে গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্টারমার স্পষ্ট করে জানান, তাকে সরাতে দলের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এবং তিনি সরকার পরিচালনার কাজ চালিয়ে যাবেন। তিনি গত ৪৮ ঘণ্টার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দেশের জন্য ব্যয়বহুল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রিসভাকে সরকারের কাজে মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানান।
বিদ্রোহী এমপিদের অভিযোগ, স্টারমারের নেতৃত্বে দল জনসমর্থন হারাচ্ছে এবং ধারাবাহিক নীতিগত ইউটার্ন ও দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সরকার অস্থির হয়ে পড়েছে। তাদের একাংশ চান নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এখনই শুরু হোক। অন্যরা আবার সুশৃঙ্খল উপায়ে নতুন নেতা নির্বাচনের জন্য স্টারমারের বিদায়ের রোডম্যাপ ঘোষণার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এরই মধ্যে স্টারমারের পদত্যাগের দাবিতে তিন মন্ত্রী পদ ছেড়েছেন। তারা হলেন সহিংসতা প্রতিরোধবিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী জেস ফিলিপস, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নেট জিরোবিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী মিয়াট্টা ফানবুলেহ এবং ভুক্তভোগী সুরক্ষা ও সহিংসতাবিরোধী নীতিবিষয়ক জুনিয়র মন্ত্রী অ্যালেক্স ডেভিস-জোন্স।
মূলত স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই লেবার পার্টির ভেতরে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হতে থাকে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও মাত্র দুই বছরের কম সময়ের মধ্যেই তাকে দলীয় বিদ্রোহ, নীতিগত ইউটার্ন এবং ধারাবাহিক বিতর্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্টারমার বলেন, ‘লেবার পার্টিতে নেতা পরিবর্তনের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে এবং সেটি এখনো শুরু হয়নি। দেশের মানুষ চায় আমরা সরকার পরিচালনায় মনোযোগ দিই। আমি সেটাই করছি এবং মন্ত্রিসভাকেও সেটাই করতে হবে।’
স্টারমারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দলটির প্রভাবশালী নেতাদের নীরবতা। বিশেষ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংকে ঘিরে জল্পনা বাড়ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা গোপন করেননি। স্থানীয় নির্বাচনের ফলের পর তিনি স্টারমারের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ আসতে পারে কিনা, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তবে গতকাল তিনি প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। একইভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদও সাংবাদিকদের এড়িয়ে গেছেন। ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে অবশ্য স্টারমারের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মন্ত্রী তার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব শুধু দলীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই। স্টারমার ও অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ব্রিটেনের আর্থিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের ঋণ গ্রহণ ব্যয় প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা, স্টারমারের পরিবর্তে যদি আরো বামঘেঁষা কোনো নেতা আসেন, তাহলে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং এমনিতেই চাপে থাকা ব্রিটিশ অর্থনীতি আরো ঝুঁকিতে পড়বে। বর্তমানে জি-সেভেনভুক্ত উন্নত অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ব্রিটেনের ঋণ গ্রহণ ব্যয়ই সবচেয়ে বেশি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই স্টারমারকে সরানো সহজ হবে না। কনজারভেটিভ পার্টির তুলনায় লেবার পার্টিতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বেশি জটিল। আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ শুরু করতে হলে অন্তত ৮১ জন এমপিকে একটি নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে একত্রিত হতে হবে। যদিও স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করা এমপিদের সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে, তাদের মধ্যে মতাদর্শগত বিভাজন স্পষ্ট। প্রায় অর্ধেক বামপন্থী এবং বাকিদের একটি অংশ মধ্যপন্থী হওয়ায় এখনো কোনো একক বিকল্প প্রার্থীর পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হয়নি।










