মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কঠিন সময় পার করছেন। তিনি প্রকাশ্যে তা স্বীকার করতে না চাইলেও গত কয়েকদিনে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনায় তাকে রাজনৈতিক, আইনি ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সংস্কার নিয়ে বিতর্ক, বিচার বিভাগ পরিচালনার জন্য তার মনোনীত ব্যক্তিকে ঘিরে জটিলতা এবং ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটানোর প্রচেষ্টায় অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে ট্রাম্প এমন কয়েকটি সংকটের মুখোমুখি, যার অনেকগুলোই তার নিজের সিদ্ধান্তের ফল। এর মধ্যে দুটি বিষয় তার ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আরেকটি আগামী দুই বছরে তার ও রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো বিপরীত তথ্য-প্রমাণ সামনে এলেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সহজে সরে যান না। প্রথম মেয়াদে তার বড় বিরোধ ছিল প্রশাসনের ভেতরের ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে এসে সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্রদের সঙ্গেও তার মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, ওয়াশিংটন মনুমেন্টের পাশের রিফ্লেক্টিং পুলে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জিনিন পিরো সাবেক অলিম্পিয়ান ডেভিড হার্নের বিরুদ্ধে আনা গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ প্রত্যাহার করেন। জিনিন পিরো একসময় ফক্স নিউজের উপস্থাপক ছিলেন এবং ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
আদালতে জমা দেয়া ২০ পৃষ্ঠার নথিতে তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষয়ক্ষতি ভাঙচুরের কারণে হয়নি; বরং ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজের ফল। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র বিভাগ বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়ায় এ মামলা করা হয়েছিল। আদালতে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায় শেষ পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহার করা হয়।
তবে ট্রাম্প এ ব্যাখ্যা মেনে নেননি। তিনি পিরোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সাংবাদিকদের বলেন, সে ছাতার মতো ভেঙে পড়েছে। এক্ষেত্রে আদালতের বাস্তবতা ও ট্রাম্পের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
একই সময়ে ট্রাম্পের আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও তার সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী টড ব্ল্যাঞ্চকে অ্যাটর্নি জেনারেল করার প্রচেষ্টাও বাধার মুখে পড়ে। রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিন ও থম টিলিস ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে মিলে ব্ল্যাঞ্চের মনোনয়ন আটকে দেন। তাদের দাবি ছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার হওয়ার দাবি করা ব্যক্তিদের জন্য প্রস্তাবিত ১৮০ কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ তহবিল পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ তিনি নেবেন না—এ মর্মে লিখিত অঙ্গীকার দিতে হবে। বিশেষ করে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ট্রাম্প-সমর্থকদের ওই তহবিল থেকে অর্থ দেয়া হতে পারে—এমন আশঙ্কাই আপত্তির মূল কারণ ছিল। সিনেটর টিলিস এ তহবিলকে ‘দুষ্কৃতকারীদের জন্য ক্ষতিপূরণের তহবিল’ বলে আখ্যা দেন।
শনিবার ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে জানান, ব্ল্যাঞ্চ ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবেই দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি কংগ্রেসে ওই তহবিল অনুমোদনের জন্য চাপ অব্যাহত রাখবেন। তিনি লেখেন, এটি আবারো আলোচনায় আসবে এবং আমি এটি বাস্তবায়ন করব।
কিন্তু সিনেটের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। পরদিন ব্ল্যাঞ্চ সিনেটরদের দাবি মেনে দুটি চিঠি প্রকাশ করেন। কর্নিন ও টিলিস পরে জানান, ওই চিঠি তাদের উদ্বেগ দূর করেছে। তবে ট্রাম্প বলেন, তিনি ওই নথি দেখেননি এবং তারা কী বিষয়ে একমত হয়েছেন, তাও তার জানা নেই।
রিফ্লেক্টিং পুল মামলা বা ক্ষতিপূরণ তহবিলের বিতর্ক সাধারণ মার্কিন ভোটারদের কাছে খুব বড় ইস্যু নয়। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা ভিন্ন বিষয়। ট্রাম্প আবারো অভিযোগ করেছেন, ইরান আলোচনার বিষয়ে প্রতারণা করছে। রোববার তিনি দাবি করেন, ইরানি কর্মকর্তাদের অনুরোধ এবং আরব মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বানে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলা বাতিল করেছিলেন।
কিন্তু পরে ইরান নতুন কোনো সরাসরি আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করলে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, তারা বৈঠক চায়—কেউ কেউ বলবে অনুরোধ করছে। আলোচনা শুরু হয়, সামনে আরো বৈঠকের সূচি থাকে, অথচ প্রকাশ্যে তারা বলে কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিবিসির সহযোগী সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনা নির্ধারিত হয়নি। অন্যদিকে এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে তাদের একমাত্র আলোচনা হচ্ছে ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ফলে আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট অমিল দেখা যাচ্ছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায়ও প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের জরিপে তার জনপ্রিয়তা ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। সিএনএন, কুইনিপিয়াক ও ইউগভের জরিপেও প্রায় একই ফল পাওয়া গেছে। এটি ২০২১ সালের ক্যাপিটল হামলার পর তার জনপ্রিয়তার সমান বা আরো কম। আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে কেবল পদত্যাগে বাধ্য হওয়া রিচার্ড নিক্সনের জনপ্রিয়তা এর চেয়ে কম ছিল। তবে ট্রাম্প এসব জরিপ প্রত্যাখ্যান করে ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ভুয়া সংবাদমাধ্যমের বানানো জরিপ নয়, আমার প্রকৃত জনপ্রিয়তা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
আর মাত্র তিন মাস পর যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অতীতে প্রতিকূল জনমত জরিপের মধ্যেও ট্রাম্প নির্বাচনে ভালো ফল করেছেন। তাই জরিপের ফলই শেষ কথা নয়। তবে সাম্প্রতিক আইনি, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ—যেগুলোর কিছু তিনি প্রকাশ্যেই অস্বীকার করছেন—শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ভোটারদের রায়। যদি মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রত্যাশিত ফল না পায়, তাহলে সেটিই হতে পারে এমন আরেকটি বাস্তবতা, যার মুখোমুখি ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত হতেই হবে।










