দৈনন্দিন জীবনে সমুদ্রের প্রভাব গভীর ও বহুমাত্রিক। পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা সমুদ্র দিয়ে আচ্ছাদিত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবহন হয় সমুদ্রপথে, আর কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা সরাসরি এর ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আর জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভূরাজনীতির অন্যতম প্রধান মঞ্চে পরিণত হয়েছে সমুদ্র।

এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারকরা এ চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবেলা করে। তাদের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ, পণ্যের মূল্য ও জাতীয় নিরাপত্তা। বর্তমানে নানাভাবে চাপের মুখে রয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। তবে স্বস্ত্বির বিষয়, শান্তি বজায় রাখার জন্য কূটনীতির নানা পথ এখনো খোলা রয়েছে। এসব কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক চুক্তি, দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা, এমনকি সরকারবহির্ভূত উদ্যোগ।

এর প্রতিটি উদাহরণই দেখা যায় আর্কটিক অঞ্চলের নৌপরিবহন, সমুদ্রতলের খনিজ আহরণ ও অতিরিক্ত মাছ ধরা ঘিরে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা উত্তেজনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে।

আর্কটিক নৌপরিবহন: নতুন পথ, নতুন ঝুঁকি

আর্কটিক মহাসাগরের বরফ গলে যাওয়ায় এমন কিছু নৌপথ খুলে যাচ্ছে, যেগুলো আগে বছরের বেশিরভাগ সময়ই অচল থাকত। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার উপকূলঘেঁষা নর্দার্ন সি রুট ও কানাডার আর্কটিক দ্বীপপুঞ্জ পেরিয়ে যাওয়া নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ। দুটি পথই বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সময় ও জ্বালানি খরচ কমানোর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী সংকীর্ণ পথগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।

তবে আর্কটি্কে নৌপরিবহন নানা জটিল সমস্যাও তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ আর্কটিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি জোরদার করতে চাইছে। আর এতেই একে অপরের সঙ্গে দাবি ও কৌশলগত স্বার্থের সংঘাত তৈরি হচ্ছে।

এ ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস্তব ঝুঁকি। আর্কটিকের অনেক জলরাশি এখনো সঠিকভাবে মানচিত্রায়িত নয়। জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা একদমই সীমিত, আর চরম আবহাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাড়লে রাজনৈতিক সংঘাত বা দুর্যোগজনিত কোনো বড় দুর্ঘটনা সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। আর এর প্রভাব পড়বে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায়।

আর্কটিক কাউন্সিল অঞ্চলটির দেশগুলোর জন্য প্রধান সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম হলেও এটি সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারে না। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর এ কাউন্সিলের কার্যক্রম এক বছরের বেশি সময় স্থবির ছিল। পরে শুরু হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও রাশিয়ার একতরফা সিদ্ধান্ত এবং রাশিয়া–চীনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কাউন্সিলের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিজ্ঞানভিত্তিক সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা নিরাপত্তা ও পরিবেশসংক্রান্ত গবেষণায় একসঙ্গে কাজ করছে। ভবিষ্যতে বরফ গলা, চরম আবহাওয়া ও জরুরি সাড়া দেয়ার বিষয়ে তথ্য ভাগাভাগি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।

সমুদ্রতলের খনিজ: নিয়ন্ত্রণের লড়াই

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বৈশ্বিক রূপান্তরের ফলে নিকেল, কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ ও বিরল খনিজের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। স্মার্টফোন ও ব্যাটারি থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমানের মতো আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব ক্ষেত্রেই এসব খনিজ অপরিহার্য। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত খনিজ ভাণ্ডারের কিছু অংশ রয়েছে সমুদ্রের গভীর তলদেশে, বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াইয়ের কাছে ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন জোনে। এ সম্ভাবনা সরকার ও করপোরেশনগুলোর মধ্যে সমুদ্রতলের খনিজ আহরণে আগ্রহ বাড়িয়ে তুলেছে।

সমুদ্রতল থেকে খনিজ আহরণ চীনের আধিপত্যে থাকা বৈশ্বিক খনিজ সরবরাহ ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে। কিন্তু গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত, আর খননের কারণে কী ধরনের ক্ষতি হবে তাও অনিশ্চিত। এ কারণে গভীর সমুদ্র খননের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ৪০টি দেশ।

আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা এসব খনিজ নিয়ে প্রতিযোগিতা নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন কনভেনশনের আওতায় গঠিত ইন্টারন্যাশনাল সিবেড অথরিটি এখনো কার্যকর খননবিধি চূড়ান্ত করতে পারেনি। এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক সংগঠন, কোম্পানি ও কিছু সরকার খননে বিরতির দাবি জানাচ্ছে। এমনকি কিছু বীমা কোম্পানি গভীর সমুদ্র খনন প্রকল্পে বীমা দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর ফলে নরওয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত লাইসেন্স স্থগিত করেছে। আর পরিবেশগত ঝুঁকি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এসব খনিজ না কেনার অঙ্গীকার করেছে বিএমডব্লিউ, ভলভো ও গুগল।

অতিরিক্ত মাছ ধরা

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে বহু এলাকায় মাছের মজুত কমে যাচ্ছে, যা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা, সামুদ্রিক পরিবেশ ও খাদ্যের দামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগও জোরদার হচ্ছে।

২০২৫ সালে অনেক দেশ ‘হাই সিজ ট্রিটি’ অনুমোদন করে, যা আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা গঠনের পথ খুলে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য, পাশাপাশি নরওয়ে ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো যৌথভাবে মাছ ধরার কোটা নির্ধারণের মাধ্যমে অতিরিক্ত আহরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে