ত্রয়োদশ ওয়ানডে বিশ্বকাপ দেখছে একের পর এক রেকর্ড। ভারতে চলমান এবারের আসরে সবচেয়ে বড় চমকটা জমা ছিল গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের জন্যই। গত মঙ্গলবার মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে রচিত হলো নতুন ইতিহাস। ওয়ানডেতে রান তাড়া করার সময় প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি করেছেন ম্যাক্সওয়েল। একই সঙ্গে নন-ওপেনার হিসেবেও প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির কীর্তি এটি। এটা আবার স্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতিতে আসেনি। আফগানিস্তানের উজ্জীবিত বোলিং অ্যাটাকের মুখে ৯১ রানে ৬ উইকেট নেই, এমন ধ্বংসস্তূপ থেকে লড়াই করে তিনি ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করে অজিদের এনে দেন অবিস্মরণীয় এক জয়। ওই জয়টি অস্ট্রেলিয়ার সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে দেয়।
২১ চার ও ১০ ছক্কার সাহায্যে ১২৮ বলে ২০১ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে অসংখ্য রেকর্ড গড়ে দলকে অভাবনীয় এক জয় এনে দেন ৩৫ বছর বয়সী ম্যাক্সওয়েল। তাও শারীরিক ও মানসিক প্রচণ্ড বাধা ও ধকল কাটিয়ে উঠে তিনি এমন বীরত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। প্রচণ্ড গরম ও চাপের মধ্যে ক্র্যাম্পে ভুগছিলেন ম্যাক্সওয়েল, ব্যথায় একটি পর্যায়ে মাঠেই শুয়ে পড়েন। কিন্তু মাঠ ছাড়েননি। হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে পারছিলেন না। তখন দলের প্রয়োজনে ফুটওয়ার্ক ছাড়া, মুভমেন্ট ছাড়াই ব্যাটিং করে বিশ্বকে হতবাক করে দেন তিনি।
এখন ক্রিকেট বিশ্বে ম্যাক্সওয়েল বন্দনা। তার ইনিংসটিকে কেউ বলছেন ইতিহাসের সেরা, কারো কাছে এটি অন্যতম সেরা। দেখে নেয়া যাক, ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ১০ ওয়ানডে ইনিংস।
ভিভ রিচার্ডস ১৮৯* (১৭০ বল), প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড ১৯৮৪: সম্পন্ন হওয়া কোনো ওয়ানডে ইনিংসে পুরো দলের মোট রানের মধ্যে শতকরা হিসেবে বেশির ভাগ রান করার রেকর্ডটা এখনো ধরে রেখেছেন ভিভ রিচার্ডস। ১৯৮৪ সালে ম্যানচেস্টারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১১ রানে ২ উইকেট হারানোর পর ব্যাটিংয়ে নামেন ভিভ। একটি সময় ১৬৬ রানে ৯ উইকেট হারায় দল। এরপর ১১ নম্বরে নামা মাইকেল হোল্ডিংকে নিয়ে তুললেন আরো ১০৬ রান। এভাবে ভিভ করে ফেললেন ১৮৯ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাকি ১০ ব্যাটার মিলে করেন ৭৩ রান।
কপিল দেব ১৭৫* (১৩৮ বল), প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে ১৯৮৩: ১৯৮৩ সালের মার্চে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩৮ বলে ৮২ রান করে সামর্থ্যের প্রমাণ দেন কপিল দেব। কিন্তু ওই বছর জুনে বিশ্বকাপে যা করলেন, তা তাকে স্থান দিল ইতিহাসে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ভারত ৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেললে ব্যাটিংয়ে নেমে পড়তে হয় কপিলকে। এরপর ভারত ১৭ রানে ৫টি, ৭৮ রানে ৭টি ও ১৪০ রানে ৮টি উইকেট হারায়। যদিও একপ্রান্তে লড়ে যাচ্ছিলেন ভারতীয় দলনায়ক। এ পথে তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নেন। কপিল ১৬ বাউন্ডারি ও ৬ ছক্কায় ১৩৮ বলে ১৭৫ রানের ইনিংস খেললে ভারত পায় ৮ উইকেটে ২৬৬ রানের পুঁজি। জবাবে জিম্বাবুয়ে ২৩৫ রানে অলআউট।
সাঈদ আনোয়ার ১৯৪ (১৪৬ বল), প্রতিপক্ষ ভারত ১৯৯৭: ১৯৯৭ সালে চেন্নাইয়ে ভারতের বিপক্ষে ওপেন করতে নেমে ১৪৬ বলে ১৯৪ রানের ইনিংস খেলেন সাঈদ আনোয়ার। ২২ বাউন্ডারি ও ৫ ছক্কায় ইনিংসটি সাজান তিনি। পাকিস্তানের আর কোনো ব্যাটার ৪০ রানও করতে পারেননি, সেখানে সাঈদ আনোয়ার একাই করেন ১৯৪! ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও ৪৭তম ওভারে টপ-এজ হয়ে সাজঘরে ফেরেন এ বামহাতি ব্যাটার। ১২ বছর পর্যন্ত ওয়ানডের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটা ধরে রেখেছিলেন সাঈদ আনোয়ার। তার বীরত্বে পাকিস্তান পায় ৫ উইকেটে ৩২৭ রানের পুঁজি। পরে রাহুল দ্রাবিড়ের সেঞ্চুরির পরও ভারত ২৯২ রানে অলআউট হয়।
মার্টিন গাপটিল ২৩৭* (১৬৩ বল), প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২০১৫: ওয়েলিংটনে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথম ওভারেই মার্টিন গাপটিলকে জীবন দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মারলন স্যামুয়েলস। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাননি এ ডানহাতি ব্যাটার। ১৬৩ বলে ২৪টি বাউন্ডারি ও ১১টি ছক্কার সাহায্যে ২৩৭ রানের হার না মানা ইনিংস খেলে তিনি অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। তার ভুবন কাঁপানো ইনিংসে ভর করে নিউজিল্যান্ড পায় ৬ উইকেটে ৩৯৩ রানের সৌধ। জবাব দিতে নেমে ‘ডু অর ডাই’ পরিস্থিতিতে বেপরোয়া ব্যাটিং করে ৩০.৩ ওভারে ২৫০ রান করে অলআউট হয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গাপটিলের ইনিংসটি আজও বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ।
রোহিত শর্মা ২৬৪ (১৭৩ বল), প্রতিপক্ষ শ্রীলংকা ২০১৪: শিখর ধাওয়ান বিশ্রাম পাওয়ায় একাদশে সুযোগ মেলে রোহিত শর্মার। কাঁধ ও আঙুলের চোট থেকে সদ্যই সেরে ওঠা সতেজ রোহিত প্রথম ওভার মেডেনই দিলেন। প্রথম ১৮ ওভার থেকে নিতে পারলেন মাত্র ৪ রান। কিন্তু এরপর সংহার মূর্তিতে তিনি। ৫০ করলেন ৭২ বলে, ১০০ পেলেন ঠিক ১০০ বলে, ১২৫ বলে এল ১৫০, ২০০ বলে ২৫১ ও ১৬৬ বলে ২৫০ রান করেন তিনি। তার বিস্ফোরণে ইডেনের ফ্লাট উইকেটে ৪০৪ রানের সৌধ গড়ে ভারত। ম্যাচটিতে স্বাগতিকরা জিতেছিল ১৫৩ রানে।
ফখর জামান ১৯৩ (১৫৫ বল), প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২১: চলতি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৮১ বলে ১২৬ রানের ইনিংস খেলে পাকিস্তানকে জেতানো ফখর জামানের ব্যাটিং বীরত্বের নজির আরো আছে। ২০১৮ সালে বুলাওয়েতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৫৬ বলে ২১০ রান করার কীর্তি আছে তার। তবে তিনি সবচেয়ে এগিয়ে রাখেন ২০২১ সালে জোহানেসবার্গে ১৫৫ বলে খেলা ১৯৩ রানের ইনিংসটাকে। ৩৪২ রানের টার্গেটে ব্যাটিংয়ে নেমে পাকিস্তানের আর কেউ ৩১ অতিক্রম করেননি। এর পরও দলটি ৩২৬ পর্যন্ত যেতে পেরেছে শুধু ফখর জামানের বীরত্বে। ১৮টি চার ও ১০ ছক্কায় ১৯৩ রান করে মিশন অসম্পন্ন রেখেই তিনি রানআউট হয়ে যান। ওয়ানডেতে অসফল রান চেজে এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস।
শচীন টেন্ডুলকার ১৭৫ (১৪১ বল), প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া ২০০৯: ফখর জামানের মতো ওয়ানডেতে আরেকটি মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন শচীন টেন্ডুলকার এবং তিনিও পরাজিত দলে। ২০০৯ সালে হায়দরাবাদে আগে ব্যাটিং করে অস্ট্রেলিয়া ৪ উইকেটে ৩৫০ রানের সৌধ গড়ে। জবাব দিতে নেমে শচীনের বীরোচিত ব্যাটিংয়ে ভারত জয়ের পথেই ছিল। শেষ ১৮ বলে ভারতের প্রয়োজন ১৯ রান, হাতে ৪ উইকেট। তখনই আউট হয়ে যান শচীন। ৩৪৭ রানে অলআউট হয়ে যায় স্বাগতিকরা। ভারত সেদিন না জিতলেও ১৪১ বলে ১৯টি বাউন্ডারি ও ৪ ছক্কায় শচীনের খেলা ১৭৫ রানের ইনিংসটি চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
সনাথ জয়সুরিয়া ১৮৯ (১৬১ বল), প্রতিপক্ষ ভারত ২০০৯: শারজায় ২০০০ সালে কোকা-কোলা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালে ভারতকে ২৪৫ রানে হারায় শ্রীলংকা। বলা উচিত, ভারতকে একাই হারিয়ে দেন সনাথ জয়সুরিয়া। ১৬১ বলে ১৮৯ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলেন তিনি ২১টি চার ও ৪টি ছক্কার সাহায্যে। তার ব্যাটে ভর করে ২৯৯ রানের পুঁজি পায় ভারত। যে পিচে বাকি ব্যাট করা ১৭ জনের মধ্যে মাত্র তিনজন দুই অংক পেরিয়েছেন ও ১৪ জনই এক অংকে আটকে ছিলেন, সেই পিচেই কিনা জয়সুরিয়া ঝড় তোলেন।
মার্কাস স্টয়নিস ১৪৬* (১১৭ বল), প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড ২০১৭: অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৮৭ রান তাড়া করতে নেমে ২৮০ রানে অলআউট অস্ট্রেলিয়া। অজিদের ৬ রানের হার। অথচ তখনো ১৮ বলের খেলা বাকি। এ ম্যাচেই ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক ব্যক্তিগত ইনিংসের জন্ম হয় মার্কাস স্টয়নিসের ব্যাটে (১১৭ বলে ৯ চার ও ১১ ছক্কায় ১৪৬ রান)। অস্ট্রেলিয়া ৫৪ রানে ৫ উইকেট হারানোর পর ব্যাটিংয়ে নামেন স্টয়নিস। সেখান থেকেই অবিশ্বাস্য এক লড়াই শুরু হয় তার। জেমস ফকনার, প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক ও জস হ্যাজেলউডকে নিয়ে চারটি কার্যকর জুটিতে তিনি দলকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান। ২৪ বলে ৫৪ রানের জুটি গড়েন জস হ্যাজেলউডের সঙ্গে। এ জুটিতে হ্যাজেলউডের অবদান শূন্য! হ্যাজেলউড রানআউট হয়ে গেলে বিফলেই যায় স্টয়নিসের বীরত্বপূর্ণ ইনিংস।
থিসারা পেরেরা ১৪০ (৭৪ বল), প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড ২০১৯: আরেক পরাজিত বীরের গল্প। মাউন্ট মঙ্গানুইতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২০ রানের টার্গেটে নেমে ২৯৮ রানে গুটিয়ে ২১ রানে হেরেছে শ্রীলংকা। অথচ তখনো ২২ বলের খেলা বাকি। ৭ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামা থিসারা পেরেরা ৮ চার ও ১৩ ছক্কার সাহায্যে ৭৪ বলে ১৪০ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে দলকে জয়ের কাছাকাছি নিয়ে আউট হয়ে যান।
দানুস্কা গুনাতিলাকার ফিফটিতে দুর্দান্ত সূচনা করে শ্রীলংকা। এরপর ধস শুরু হয়। দলের ১২১/৫ স্কোরের সময় ব্যাটিংয়ে নামেন থিসারা। একটি পর্যায়ে ১২৮ রানে ৭ উইকেটের পতন ঘটলে পরাজয়ের কাছাকাছি চলে যায় শ্রীলংকা। যদিও এরপর থিসারার অবিশ্বাস্য ব্যাটিংয়ে মরা ম্যাচে প্রাণ ফেরে এবং জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত হেরে যায় সিংহলিজরা। ইএসপিএনক্রিকইনফো










