একদিকে ঘরের মাঠে অপ্রতিরোধ্য ভারত, অন্যদিকে ‘জায়ান্ট কিলার’ নিউজিল্যান্ড। এ লড়াইকে অনেকেই দেখছেন স্টার ওয়ার্স সিনেমার ‘ডেথ স্টার’ বনাম ‘ইউয়োকস’-এর (ছোট কিন্তু লড়াকু জাতি) যুদ্ধ হিসেবে। ভারতের বিধ্বংসী ব্যাটিং লাইনআপকে যদি একটি মহাকাশ দানব ধরা হয়, তবে নিউজিল্যান্ডের তুরুপের তাস হতে পারে অফস্পিন।

চলতি বিশ্বকাপে ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ যেন এক অজেয় শক্তির নাম। প্রথম দিকে কিছুটা ধীরগতিতে শুরু করলেও শেষ তিন ম্যাচের দুটিতেই তারা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড গড়েছে। তবে এ বিধ্বংসী শক্তির একটি দুর্বল জায়গা বা ‘সফট স্পট’ খুঁজে বের করেছে প্রতিপক্ষরা। আর সে দুর্বলতা হলো—অফস্পিন। আজ আহমেদাবাদে নিউজিল্যান্ডের কোল ম্যাককনচি বা গ্লেন ফিলিপসরা হতে পারেন ভারতের জন্য বড় বাধা।

ভারতের এ সমস্যার পেছনের কারণটা বেশ পরিষ্কার। রিংকু সিংয়ের জায়গায় সাঞ্জু স্যামসনকে দলে নেয়ার পরও ভারতের ব্যাটিং লাইনআপে বাঁহাতি ব্যাটারের সংখ্যা অনেক বেশি—প্রথম আটজনের মধ্যে পাঁচজনই বাঁহাতি। আর অফস্পিনাররা বাঁহাতি ব্যাটারদের জন্য বল ঘুরিয়ে বাইরে নিয়ে যান, যা ক্রিকেটীয় কৌশলে প্রতিপক্ষকে বাড়তি সুবিধা দেয়।

অফস্পিনকে এখন আধুনিক ক্রিকেটে হয়তো কিছুটা সেকেলে মনে হতে পারে, কিন্তু এটি এমন এক দক্ষতা, যা যে কেউ চাইলেই কিছুটা অনুশীলন করে আয়ত্ত করতে পারে। এ সহজ কাজটিই এখন ভারতের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, এবারের টি২০ বিশ্বকাপে স্পিনারদের করা দুই ওভারের স্পেলের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই (৪৬.৪৩%) ছিল অফস্পিন, আর এক ওভারের স্পেলের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬৩.৮৯%)!

ফলে ভারত ক্রমাগত ডানহাতি ফিঙ্গার-স্পিনের তোপের মুখে পড়ছে। সালমান আগা বা গেরহার্ড এরাসমাসের মতো শৌখিন বোলার থেকে শুরু করে সাইম আইয়ুব, সিকান্দার রাজা বা উইল জ্যাকসের মতো অলরাউন্ডার—সবাই ভারতের বিপক্ষে অফস্পিনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। এমনকি এইডেন মার্করাম, কলিন অ্যাকারম্যান বা আরিয়ান দত্তের মতো বোলাররাও ভারতের ব্যাটারদের চেপে ধরেছেন।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রতিপক্ষের এ কৌশল কাজও দিচ্ছে। টুর্নামেন্টে অন্য কোনো দলের ব্যাটাররা অফস্পিনের বিপক্ষে এত বেশি উইকেট (১৫টি) হারাননি এবং কোনো দলের গড়ও (১৫.৮৭) ভারতের চেয়ে খারাপ নয়। সুপার এইট পর্বে পৌঁছানো দলগুলোর মধ্যে ভারতের ব্যাটারদের রান তোলার গতিও (১২০.২০) ছিল সবচেয়ে ধীর।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো অভিষেক শর্মার ফর্ম। যাকে মনে করা হচ্ছিল ভবিষ্যতের মহাতারকা, তিনি বিশ্বকাপের শুরুতে টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে আউট হয়েছেন, যার মধ্যে দুবারই ছিল প্রথম ওভারে অফস্পিনের শিকার। এমনকি দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ঈশান কিষাণও অফস্পিনের বিপক্ষে মাত্র ৪৮ বলে ৫ বার আউট হয়েছেন (গড় ১৩.০০)। তিলক ভার্মাও অফস্পিনের সামনে রানের গতি বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমনকি ডানহাতি সূর্যকুমার যাদবও এ টুর্নামেন্টে অফস্পিনের বিপক্ষে খুব একটা স্বচ্ছন্দে নেই।

নিউজিল্যান্ডের জন্য আশার আলো হয়ে এসেছেন ৩৪ বছর বয়সী কোল ম্যাককনচি। ইনজুরি রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আসা এ খেলোয়াড় সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই বিপজ্জনক বাঁহাতি কুইন্টন ডি কক ও রায়ান রিকেলটনকে আউট করে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন। মিচেল স্যান্টনারের জাদুকরী ঘূর্ণি আর ম্যাট হেনরির পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড দল চাইবে ম্যাককনচি ও গ্লেন ফিলিপসকে দিয়ে ভারতের পাওয়ারপ্লেতে ধাক্কা দিতে।

ভারতের এ ‘প্ল্যানেট-কিলিং’ ব্যাটিং লাইনআপকে থামাতে হলে কিউইদের প্রধান অস্ত্র হবে অফস্পিন। ডেভিড বনাম গোলিয়াথের এ লড়াইয়ে ছোট এ ‘অফস্পিন’ অস্ত্রটিই হয়তো শেষ পর্যন্ত বড় পার্থক্য গড়ে দেবে।