বার্সেলোনার বিপক্ষে আট গোলে জেতা ম্যাচে পঞ্চম গোলটি এসেছিল জশুয়া কিমিচের কাছ থেকে। যদিও গোলদাতার চেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন যিনি অ্যাসিস্ট করেছিলেন সেই আলফনসো ডেভিস। দারুণ নৈপুণ্যে বল পায়ে বার্সা ডিফেন্সকে হতচকিত করে দিয়েছিলেন কানাডিয়ান এই তরুণ। এবার নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটির প্রস্তুতি নিচ্ছেন বায়ার্নের এই তুরুপের তাস। যদিও ডেভিসের জীবনের শুরুর গল্পটা এই গোল কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে উঠার মতো এতটা নান্দনিক না। সেটি শুরু হয়েছিল শরণার্থী শিবিরের উদ্বাস্তু জীবন থেকে।
এই লেফট-ব্যাকের জন্ম হয়েছিল ঘানার একটি শরণার্থী শিবিরে। এর আগে তার বাবা ডেবেয়াহ এবং মা ভিক্টোরিয়া পিতৃভূমি লাইবেরিয়া ছেড়ে এসেছিলেন সেখানে চলমান নাগরিক সংঘাত এড়াতে। ডেবেয়াহ বলেন, বাঁচতে হলে আপনাকে হাত অস্ত্র নিয়ে ঘুরতে হবে এবং আমরা সেটি করতে চাইছিলাম না। ভিক্টোরিয়া বলেন, দৃশ্যগুলো ছিল ভীতিজাগানিয়া। খেতে যেতে হলে আপনাকে মৃতদেহ মাড়িয়ে যেতে হতো।
এসব কারণে ডেবেয়াহ ও ভিক্টোরিয়া আশ্রয় নিয়েছিলেন ঘানার রাজধানী আক্রার উত্তরে বুদুবুরামের একটি শরণার্থী শিবিরে। সেখানকার জীবন নিয়ে ভিক্টোরিয়া বলেন, জীবন সেখানে ছিল একটি কন্টেইনারে ঢুকে চাবি বাইরে ছুঁড়ে মারার মতো। সেখান থেকে বেরুনোর কোন উপায় নেই।
সৌভাগ্যবশত ডেভিসের পরিবার বেরিয়ে কানাডা যাওয়ার একটি উপায় পেয়েছিল। ডেবেয়াহ বলেন, সে জায়গা সম্পর্কে অমি কিছুই জানতাম না, কাউকে চিনতাম না। কিন্তু তারপরও গেলাম।
এরপর ডেভিসের পরিবারের ঠাঁই হয় এডমন্টনে। ২০০৬ সাল থেকে ডেভিস স্কুলে যাওয়া শুরু করে এবং খুব দ্রুতই তার পায়ে স্থান পায় ফুটবল। এরপর তার স্থান হয় ফ্রি ফুটি নামক একটি সংগঠনে। যারা সুবিধাবঞ্চিত ৪ হাজার শিশুকে বিনামূল্যে ফুটবল খেলার সুযোগ করে দেয়।
ফ্রি ফুটির সিইও টিম অ্যাডামস বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক মতো এগুলে কি হতে পারে আলফনসো তার একটি উদাহরণ। যদিও এই ছেলেটির মাঝে বিশেষ কিছু একটা ছিল।
অ্যাডামসই এরপর ডেভিসের ব্যাপারে বলেন মার্কো বসিওকে। যিনি সেন্ট নিকোলাস ক্যাথলিক স্কুলের শিক্ষক এবং ফুটবল একাডেমির পরিচালক। এরপর ডেভিসের প্রতিভা সম্পর্কে ভ্যানকুভার হোয়াইটক্যাপকে জানান বসিও। তিনি বলেন, ওপরে উঠার ব্যাপারে ডেভিসের শক্তিশালী মানসিকতা ছিল। আমি হোয়াইটসক্যাপ কর্তৃপক্ষকে ফোন করে জানায়। তারা তাকে আমন্ত্রণ জানায় ট্রায়ালের জন্য, আমি যা দেখেছি তা তারাও দেখেছে।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে ডেভিসকে অনেক দূরে যেতে হচ্ছিল দেখে তার মা এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি বলেন, আমি আতঙ্কিত ছিলাম। আমি জানি তার বয়সী ছেলেরা কি করে এবং আমি চাচ্ছিলাম না তার সাথেও তেমনটা হোক। আমি এটা ১৬-১৭ বছর হওয়া পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু সে আমাকে প্রতিশ্রুতি দিল যে সে বদলে যাবে না এবং সে আমাদের গর্বিত করেছে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে হোয়াটসক্যাপের হয়ে তার এমএলএসে তার অভিষেক হয় এবং আট মাসের মাঝে ২১ শতকে জন্ম নেয়া প্রথম খেলোয়াড় প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে শীর্ষ পর্যায়ে খেলার সুযোগ পায়।
২০১৭ সালে ডেভিস কানাডার নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং জাতীয় দলে নির্বাচনের জন্য উপলব্ধ হন। এক সপ্তাহ পর তার অভিষেকও হয়। ২০১৭ সালের গোল্ড কাপে এই উইঙ্গার কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী গোলদাতায় পরিণত হন। এরপর ২০১৮ সালের গ্রীষ্মে বায়ার্ন মিউনিখ থেকে তার ডাক আসে এবং ১৮ বছর বয়সে তিনি জার্মানিতে চলে যান।
বায়ার্নের স্পোর্টিং ডিরেক্টর হাসান সালিহামিডিক বলেন, আমরা তাকে দলে নিয়েছি, কারণ আমাকে তার প্রজন্মের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে পাচ্ছিলাম। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে বায়ার্নের প্রথম দলে তার অভিষেক হয়।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে নিজেকে এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা লেফট-ব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ডেভিস। তার গতি ও ড্রিবলিংয়ে মুগ্ধ ফুটবল দুনিয়া। হানসি ফ্লিক বলেন, তার উন্নতি অভাবনীয়। তাকে উইঙ্গার হিসেবে নেয়া হলেও, ফুলব্যাক হিসেবেও সে অসধারণ।
তাকে নিয়ে জার্মান সুপারস্টার থমাস মুলার বলেন, তার মতো খেলোয়াড় আমাদের কখনো ছিল না। জেরোমে বোয়াটেং বলেন, আপনি সবসময় তার মতো তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড় দেখবেন না। আমরা তার কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করি, কারণ সে আরো উন্নতি লাভ করতে পারে।
কেবল মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও ডেভিস তার আচরণ দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছে। বায়ার্ন চেয়ারম্যান কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে বলেন, সে কেবল তার খেলা দিয়েই আমাদের দর্শকদের মুগ্ধ করে না। মাঠের বাইরে তার আচরণ দিয়েও কলে।
গর্বিত মা ভিক্টোরিয়া বলেন, আপনি সেরা হতে পারেন । কিন্তু যদি আপনাদের শ্রদ্ধা না দেখান তাহলে কেউ আপনাকে পছন্দ করবে না।
মার্কা অবলম্বনে










