হিন্দি সিনেমা মানেই গানের বিশেষ স্থান থাকবে সেখানে। সংগীত সেখানে সিনেমার সূচনা থেকেই বিশেষ হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের অন্য কোনো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি গানের ক্ষেত্রে এতটা গুরুত্ব দেয় না। ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি—বিশেষত বলিউড—তার ১০০ বছরের যাত্রায় সংগীত নিয়ে নানা নিরীক্ষা করেছে। পেয়েছে অসাধারণ সব সংগীত পরিচালক। ওপি নায়ার তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ভারতীয় সিনেমার সংগীতে তার অবদান অনস্বীকার্য। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংগীত নিয়ে নানা নিরীক্ষা করে তিনি সিনেমার সংগীতের সংজ্ঞাই বদলে ফেলেছিলেন। নানা সময় প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে সংগীত তৈরি করেছেন নায়ার। সুরের পাশাপাশি বাদ্যের ব্যবহারেও তিনি ছিলেন প্রথাবিরোধী।
হিন্দি সিনেমার গানে একসময় সারেঙ্গি খুব একটা ব্যবহার হতো না। হলেও কোনো একটা বিরহের গান বা সিচুয়েশনে তা বাজানো হতো। ওপি নায়ার পটভূমিতে আসার পর চলতি এ নিয়ম ভেঙে যায়। সারেঙ্গি বাজানো হতো খুব নিচু মাত্রায় কিন্তু নায়ার তাকে নিয়ে যান উঁচুতে। সারেঙ্গি যেখানে তুলত বেদনার সুর, নায়ারের হাতে তা আনন্দের পটেও বাজতে শুরু করে। ১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘হাওড়া ব্রিজ’ সিনেমার ‘ইয়ে কেয়া কার ডালা তুনে’ গানে তা টের পাওয়া যায়। একই ধারায় ‘সিআইডি’তে (১৯৫৬) ছিল ‘আখোঁ হি আখোঁ মে ইশারা হো গ্যায়া’। দুটো গানেই সারেঙ্গির অন্য রকম ব্যবহার দেখা যায় এবং তা আজও শ্রোতাদের কানে মধুবর্ষণ করে।
আজকের দিনে বলিউডের বহু গানে সন্তুরের ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু পঞ্চাশের দশকের আগে বাদ্যযন্ত্রটি এতটা জনপ্রিয় ছিল না। সন্তুরও বাজানো হতো নরম করে। নায়ার এসে সন্তুরকে দ্রুতলয়ে বাজানোর নতুন তরিকা উপস্থাপন করলেন। তার ফল এখনো যে কেউ শুনতে পারেন ‘যায়িয়ে আপ কাহা জায়েঙ্গে’ (মেরে সানাম, ১৯৬৫) গানে। সন্তুরকে এমন করে এর আগে কখনো ব্যবহার করেনি কোনো সংগীতকার। কেবল ভারতীয় বা উপমহাদেশীয় বাদ্যই নয়, নায়ার ইউরোপীয়সহ আরো নানা অঞ্চলের বাদ্যযন্ত্রও এনেছিলেন। এর মধ্যে ক্যাস্টানেটস নামের স্প্যানিশ বাদ্যযন্ত্রটি অন্যতম। কাঠের গোলাকার দুটো খোলস বাজানো হয় আঙুল দিয়ে। নায়ারের পরিচালিত গানে এর ব্যবহার দেখা যায়।
ওপি নায়ার নিজের মতো করে তাল ও লয় নিয়ে খেলতেন। ভারতীয় সিনেমার সংগীতে বাদ্যের নতুন ধারার ব্যবহারের পাশাপাশি তালের পরিবর্তনেও নায়ারের অবদান আছে। তিনিই ‘টোঙ্গা’ বিট পরিচয় করিয়েছিলেন ভারতীয় সিনেমার গানে। ‘বান্দা পারওয়ার থাম লো জিগার’ (ফির ওহি দিল লায়া হু, ১৯৬৩), ‘যারা হওলে হওলে চালো মেরে সাজনা’ (সাওয়ান কি ঘাটা, ১৯৬৬), ‘পিয়া পিয়া মেরা জিয়া পুকারে’ (বাপ রে বাপ, ১৯৫৫) এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
শিল্পীদের ভিন্ন ভাগে গাওয়ানোর চেষ্টা করতেন নায়ার। তিনি জানতেন গানের কোন জায়গায় কেমন টান, সুর, উচ্চনাদ বা গলা নামাতে হবে। তার পরিচালিত অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘আইয়ে মেহেরবা’ (হাওয়া ব্রিজ, ১৯৫৮) মন দিয়ে শুনলে বোঝা যাবে আশা ভোঁসলে ‘ইশক কি ইমতিহা’য় যেভাবে গলা নামিয়েছেন তা এ গানকে আরো মাধুর্যে ভরিয়েছে। এসবই ছিল ওপি নায়ারের সংগীত পরিচালনার ফল। তার এ নতুন ধারার সংগীত পরিচালনা ভারতের সিনেমার গানের ক্ষেত্রে অন্যান্য সংগীত পরিচালককে নির্ভার হয়ে নিরীক্ষার সুযোগ করে দিয়েছিল। ফলে নায়ারের পথ ধরে হিন্দি সিনেমায় বিদেশী সংগীত, বাদ্য ও ধারা যুক্ত হতে শুরু করেছিল, আর সংগীত হয়েছিল বৈচিত্র্যময় ও মনোমুগ্ধকর।
স্ক্রল অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










