অস্তগামী সূর্য। উত্তাল ইজিয়ান সাগর। ঢেউয়ের ধাক্কায় খোলামকুচির মতো দুলছে ছোট একটি ডিঙ্গি নৌকা। তাতে গাদাগাদি করে বসা কিছু মানুষ। তাদের ভারে ডুবুডুবু নৌকাটি। দ্রুত উঠে আসছে পানি। এর মধ্যে আবার বন্ধ হয়ে গেল ইঞ্জিন। আতঙ্কে অস্থির যাত্রীরা। এ যাত্রা অনিশ্চয়তার দিকে, একই সঙ্গে স্বপ্নের দিকে। তারা কি পৌঁছতে পারবে গন্তব্যে!

দারাইয়া। দামেস্কের একটি শহরতলি। তিন মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ইজ্জাত মারদিনি ও মেরভেত মারদিনি দম্পতির। সারাহ, ইউসরা ও শাহেদ—যথাক্রমে তিন কন্যার নাম। ইজ্জাত সাঁতার অন্তপ্রাণ। তার তিন মেয়েকেই তিনি গড়ে তুলতে চান সাঁতারু হিসেবে। লক্ষ্য সিরিয়ার হয়ে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করা। সারাহ ও ইউসরার প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে লক্ষ্যের দিকে অনেকখানি এগিয়েছেও তারা। শাহেদ তখনো শিশু। স্বপ্ন দেখে বড় দুই বোনের মতো একদিন সেও নামবে সুইমিং পুলে। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বাদ সাধে যুদ্ধ। 

২০১১ সাল। মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। বাশার আল আসাদের সরকারকে উৎখাতের আন্দোলন। মুহুর্মুহু বোমা, গোলা ও গুলির বর্ষণে বিধ্বস্ত দামেস্ক। বিপর্যস্ত হয় সাধারণ মানুষের জীবন। বাদ যায় না মারদিনি পরিবারও। প্রায়ই আসতে থাকে নিকটাত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা পরিচিত জনের মৃত্যুর খবর। সুইমিং পুল, খেলার মাঠ ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সারাহ জার্মানি চলে যেতে চায়। সেখানে গিয়ে সে পুরো পরিবারের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করবে। কিন্তু রাজি হন না ইজ্জাত মারদিনি। কারণ, জার্মানিতে তাদের পরিচয় হবে শরণার্থী। এ পরিচয় নিয়ে তো আর অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে পারবে না তার মেয়েরা। তাছাড়া অলিম্পিকে সিরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগও যে আর থাকবে না। তাই শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশেই থেকে যেতে চান তিনি। তবে হাল ছাড়ে না সারাহ। ক্রমাগত বুঝিয়ে যায় বাবাকে। অবশেষে সম্মত হন তিনি। সারাহ ও ইউসরা রওনা হয়। লক্ষ্য জার্মানি। আর এ যাত্রাপথে তুরস্ক থেকে গ্রিসের লেসবস দ্বীপে যাওয়ার জন্য মানব পাচারকারীদের মাধ্যমে আরো অনেকের সঙ্গে তারা সওয়ার হয় ছোট ডিঙ্গিটিতে। সাল ২০১৫। 

সারাহ ও ইউসরার সাঁতার নৈপুণ্য ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে রক্ষা পায় নৌকার সব যাত্রী। শেষে সব বাধাকে অতিক্রম করে দুই বোন বার্লিনে পৌঁছায়। সেখানে ইউসরা পুনরায় সাঁতারের প্রশিক্ষণ শুরু করে। সারাহ আর সে পথ মাড়ায় না। পরিবর্তে সে শরণার্থীদের নিয়ে কাজ আরম্ভ করে। শরণার্থী অ্যাথলিটদের অলিম্পিকে অংশগ্রহণের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য ২০১৬ সালে গঠিত হয় ‘রিফিউজি অলিম্পিক টিম’। সে টিমের হয়ে ২০১৬ সালে রিও সামার অলিম্পিক গেমস এবং ২০২০ সালে টোকিও সামার অলিম্পিক গেমসে অংশগ্রহণ করে ইউসরা। কোনো পদক না জিতলেও অলিম্পিকের কর্তাব্যক্তি ও ক্রীড়াবোদ্ধাদের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে সে। 

উপরে বর্ণিত ঘটনা সত্য। এই তো গত দশকেরই। এ সত্য ঘটনা অবলম্বনে সিনেমা বানিয়েছেন ওয়েলস-মিসরীয় নারী পরিচালক স্যালি এল হোসাইনি। নাম ‘দ্য সুইমারস’। দুই আরব তরুণীকে তিনি উপস্থাপন করেছেন বাস্তব জীবনের সুপার হিরো হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে আরব মুসলিম তরুণীদের এক নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হলো। কোথা থেকে পেলেন তিনি সিনেমাটি বানানোর অনুপ্রেরণা? ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত তার একটি লেখায় বিষয়টি খোলাসা করেছেন তিনি।

সোয়ানসি শহরে ওয়েলস মা আর মিসরীয় পিতার ঘরে জন্মগ্রহণ করেন স্যালি। জন্মের কিছুদিন পর তার পরিবার কায়রো চলে যায়। সেখানে বেড়ে ওঠার সময়ে প্রচুর সিনেমা দেখতেন তিনি। অবাক বিস্ময়ে তিনি লক্ষ করেন, তাকে অনুপ্রাণিত করার মতো কোনো আরব মুসলিম নারী চরিত্র সেখানে নেই। না মিসরীয় সিনেমায়, না হলিউডে। তার মতে, সিনেমায় আরব মুসলিম নারীরা যেন দুটি পরিচয়েই সীমাবদ্ধ। যৌনাবেদনময়ী ব্যালে ড্যান্সার কিংবা আপাদমস্তক পর্দায় আবৃতা অকিঞ্চিৎকর কোনো চরিত্র। অবশ্য ৯/১১-এর পর আরেকটি পরিচয় যুক্ত হয়—জঙ্গি। তবে সময় পরিবর্তন হচ্ছে, যদিও খুব ধীরে। আর এ পরিবর্তনের পথে দ্য সুইমারস নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। স্যালি বলেন, বাস্তব জীবনের দুই সুপার হিরোকে কেন্দ্র করে তিনি এমন একটি সিনেমা বানিয়েছেন, যার অভাব তার তারুণ্যে অনুভব করেছিলেন এবং সিনেমাটি বানানোর ক্ষেত্রে লৈঙ্গিক কোনো চিন্তা তার মাথায় ছিল না। তার মতে, লিঙ্গ নির্বিশেষে সব ধরনের চরিত্রকে তুলে ধরাই একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার কাজ। এ কারণে তার প্রথম সিনেমা ‘মাই ব্রাদার দ্য ডেভিল’-এ তিনি দুই ভাইয়ের গল্প বলেছেন। পরিচালক জানান, তার মনে কখনো এ প্রশ্ন আসেনি যে তিনি কেন দুজন পুরুষকে নিয়ে সিনেমা বানাচ্ছেন। 

দ্য সুইমারস আরব মুসলিম নারীদের নতুন পরিচয় বিনির্মাণের সিনেমা। একই সঙ্গে তা শরণার্থীদের জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমা। এ সিনেমার অন্যতম বিশেষত্ব হলো, তাতে সারাহ ও ইউসরা চরিত্রের জন্য পরিচালক এমন দুজন অভিনেত্রীকে নির্বাচন করেছেন, বাস্তব জীবনেও যারা দুই বোন। একই সঙ্গে তারা আরব ও শরণার্থী। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় লেবাননে গৃহযুদ্ধের ফলে সেখানকার অসংখ্য নাগরিক ফ্রান্সে আশ্রয় গ্রহণ করে। শরণার্থী হিসেবে ফ্রান্সে আসা তেমনই একটি লেবাননীয় খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেয়া দুই বোন মানাল ইসা ও নাথালি ইসা, যারা যথাক্রমে সারাহ ও ইউসরার চরিত্রে অভিনয় করেন। 

সিনেমাটিকে বৈপ্লবিক মনে করেন পরিচালক স্যালি এল হোসাইনি। তিনি বলেন, ‘‌কায়রো ও মারাকেশে আমি সিনেমাটি প্রদর্শন করেছিলাম। যখন ছোট বোনটি রেসে জয়ী হলো, আরব দর্শকরা বাঁধ ভাঙা কান্না ও করতালিতে তাকে অভিনন্দিত করেছিল। তারা এমন কিছু দেখছিল, যা আগে কখনো দেখেনি—এক আরব তরুণী বিশ্বমঞ্চে বিজয়ের হাসি হাসছে।’ অবশ্য সারাহ ও ইউসরার সুপার হিরোয় পরিণত হওয়ার কৃতিত্ব সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে দিতে চান নির্মাতা। তার মতে, এ যুদ্ধের কারণে সমাজে পিতৃতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় যে মূল্যবোধ, তা ব্যাপকভাবে নাড়া খেয়েছিল। যদি এ যুদ্ধ না হতো, তবে সারাহ ও ইউসরা হয়তো একাকী এতদূর ভ্রমণ করার স্বাধীনতা কখনো পেত না।

দ্য সুইমারস সিনেমাটি গত নভেম্বরে মুক্তি পায়। প্রথমে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন থিয়েটারে, পরে বৈশ্বিক ওটিটি প্লাটফর্ম নেটফ্লিক্সে। সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেছে সিনেমাটি। জয় করেছে দর্শক হৃদয়। নিঃসন্দেহে দ্য সুইমারস দিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছেন স্যালি এল হোসাইনি, তা পথ দেখাবে ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের। বন্ধ হবে পর্দায় আরব মুসলিম নারীদের অবমূল্যায়িত উপস্থাপন।