সংগীতে প্রায় ১০ বছরের ক্যারিয়ার নাভেদ পারভেজের। গীতিকার, প্রযোজক ও সংগীত আয়োজক তিনি। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী হলেও নিয়মিত কাজ করছেন বাংলাদেশের সিনেমায়। পরাণের ‘‌চলো নিরালায়’ ও ‘‌লিডার আমিই বাংলাদেশ’ সিনেমার ‘‌সুরমা সুরমা’ গান দুটি এরই মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সংগীত ক্যারিয়ার, প্রবাস ও সংগীতে আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে নাভেদ পারভেজ কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুমন দে

আপনি অনেক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। বিদেশে থেকে দেশের জন্য কিছু করতে পারার আনন্দ কীভাবে উপভোগ করেন?

খুব ভালো লাগে। যখন আমার কোনো গান মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়, ট্রেন্ডে চলে আসে, তখন অনেক আনন্দ হয়। ২০১৩-১৪ সালের দিকে আমার মিউজিক ক্যারিয়ার শুরু। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে আমার এক দশক পূর্ণ হলো। শুরুর অনুভূতি ছিল অন্য রকম। প্রথম কাজ প্রথম ভালোবাসা মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিল। একটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করত। এখনো প্রতিটি কাজকে ঘিরে সেই একই এক্সাইটমেন্ট আছে।

মূলধারার সিনেমায় আপনার গানগুলো বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। সিনেমার গানে কাজ করার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেলেন?

যখন মিউজিক বুঝতে শুরু করি, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে মিউজিক কম্পোজার হব। সিনেমার জন্য সংগীত পরিচালনা করব। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারা। সিকুয়েন্সের ওপর নির্ভর করে গানের কথা ও সুর তৈরি করতে হয়। ছোটবেলা থেকেই আমার মাথায় সিনেমার গানের পোকা ঢুকে গিয়েছিল। সিনেমায় আমার গান থাকবে, এ ইচ্ছা তখন থেকেই আমার মধ্যে ছিল।

বিদেশে বসে কাজ করার ক্ষেত্রে দূরত্বের জন্য কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়?

২০১৩ সালে কিস্তিমাত সিনেমা দিয়ে আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল। সিনেমাটি ২০১৪ সালে মুক্তি পায়। এর গানগুলো সুপারহিট হয়। তখন তো আরো কাজ আসার কথা। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটল। হাতে কোনো কাজই আসেনি। দেড় বছর আমি নতুন কোনো কাজ পাইনি। এরপর আমি মুসাফির সিনেমায় কাজ করি। তারপর আবার এক বছরের বিরতি। এর বড় কারণ, আমি যুক্তরাষ্ট্রে থাকি। কিন্তু পরিচালক, অভিনয়শিল্পী সবাই বাংলাদেশে। তাই তারা আমাকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন, আমি যুক্তরাষ্ট্রে বসে কীভাবে তাদের সঙ্গে কাজ করব! আগে তো মিউজিক ডিরেক্টরদের স্টুডিওতে সিনেমার পরিচালকরা আসতেন। আলোচনা করতেন। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তো এটি সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ভালো মিউজিক করা সত্ত্বেও আমার কাছে তেমন কোনো কাজের প্রস্তাব আসত না। দেশে থাকলে যে পরিমাণ কাজের সুযোগ হয়তো আমি পেতাম, দেশের বাইরে থাকায় সে সুযোগগুলো থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি। এটি যখন আমি উপলব্ধি করলাম, তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে মিউজিকের জন্য আমি দেশে যাব। ২০১৭-২০২১ সাল পর্যন্ত আমি দেশে ছিলাম। তখন প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো কাজের প্রস্তাব আমার কাছে আসত। কখনো সিনেমা, কখনো আর্টিস্ট কিংবা অডিও কোম্পানির গানে সংগীতায়োজনের কাজ আমি পেতাম।

পরাণ সিনেমার ‘চলো নিরালায়’ ও লিডার আমিই বাংলাদেশ সিনেমার ‘সুরমা সুরমা’ গান দুটি আপনার ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক। এ দুটি গানের পেছনের গল্প একটু বলুন।

পরাণ সিনেমার গানগুলো ২০১৯ সালে করা। তখন আমি মোস্তফা কামাল রাজের ‘যদি একদিন’ সিনেমার সংগীতায়োজনের কাজ শেষ করেছি। সে সিনেমার মিউজিক শুনে রায়হান রাফী আমাকে পরাণে কাজ করার প্রস্তাব দেন। তিনি আমাকে সিনেমার গল্প শোনালেন। তারপর আমি তাকে দুটি ডেমো গান পাঠালাম। মজার ব্যাপার হলো, ওই দুটো ডেমো গানই ফাইনাল হয়ে যায়।

যখন রাফী ভাই জানালেন যে তার রোমান্টিক গান লাগবে, তখন আমি গীতিকার জনি ভাইয়ের সঙ্গে ডেমো নিয়ে কথা বলি। অয়ন চাকলাদারকে বলি ডেমো ভয়েস দেয়ার জন্য। তাকে আমি সিনেমার নাম বলিনি তখন। এভাবে আগে ‘চলো নিরালায়’ গানটি পাঠাই। পরিচালক একবার শুনেই গানটি লুফে নিলেন। প্রথমে গানটি সলো ছিল। ছয় মাস পর এটি ডুয়েট করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন গানটিতে আতিয়া আনিশার ভয়েস যুক্ত হয়।

পরাণ সিনেমার গান হিট হওয়ার পর লিডার আমিই বাংলাদেশ সিনেমার পরিচালক তপু ভাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি আমাকে তার সিনেমার জন্য একটি রোমান্টিক গান করতে বললেন। আমি তাকে তিন-চারটি টিউন পাঠাই। সবগুলোই তার বেশ পছন্দ হয়। কোন টিউন নিয়ে আমরা কাজ করব, সে ব্যাপারে কথা হচ্ছিল। সিদ্ধান্ত হলো, ‘সুরমা সুরমা’ টিউন নিয়ে আমরা এগোতে পারি। শাকিব খানের স্টারডমের সঙ্গে এটি বেশ খাপ খাবে। ব্যাপারটির সঙ্গে মিল রেখে টিউনটিতে রিদম রাখা হয়েছে, যা ভক্তদের হৃদয়ে দোলা দেবে। আমাদের মনে হয়েছিল, ‘সুরমা সুরমা’ একটি ভালো বাণিজ্যিক প্যাকেজ হতে পারে। তখন আমরা গানটি নিয়ে কাজ শুরু করি। এ টিউনের ওপর জাহিদ আকবর ভাই কথা বসান। ইমরান ও কোনাল কণ্ঠ দেন।

মূলধারার সিনেমার গানে কি এখন আপনাকে নিয়মিত পাওয়া যাবে?

আমি নিয়মিত হতে চাই। আসলে বাংলাদেশে একজন অভিনেতা হিট সিনেমা উপহার দিলে তার অনেক সুনাম হয়। গায়ক-গায়িকারাও ভালো পরিচিতি পান। কিন্তু সুরকারদের নিয়ে আলোচনা তুলনামূলক কম। আমার মনে হয়, তাদের নিয়েও আলোচনা হলে কাজের ক্ষেত্রে আগ্রহ বাড়ে। অন্যান্য দেশে গীতিকার ও সুরকারদের যথাযথ মর্যাদা দেয়া হয়। বাংলাদেশেও সম্মানের জায়গাটি নিশ্চিত করা উচিত।

সামনে আপনার কী কী আজ আসছে?

এখনো কোনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। তবে বেশ কয়েকজন পরিচালকের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে।

সংগীত নিয়ে কি আপনার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে?

যারা ভালো গায়ক-গায়িকা আছেন, কিন্তু আর্থিক প্রতিবন্ধকতা বা যথাযথ সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় নিজের প্রতিভা বিকাশ করতে পারছেন না, তাদের কাজের সুযোগ করে দেয়ার পরিকল্পনা আমার আছে। তারা যে কেউই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমার দরজা সবার জন্যই খোলা রয়েছে।