ঠিক এক যুগ আগে। দিনটি ছিল ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট। আমাদের টেলিভিশন সেটটি চালুই ছিল। হঠাৎ টেলিভিশনের পর্দায় ব্রেকিং নিউজ ভেসে উঠতে দেখি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। তারেক মাসুদ নেই। মিশুক মুনীর নেই। একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম। 

১৩ আগস্ট, ২০১১। খুব ভোরেই ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ। সফরসঙ্গী ছিলেন এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীর, তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ঢালি আল মামুন, তার স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম জলি, প্রডাকশন সহকারী ওয়াসিম, ঘর নির্মাতা জামাল ও মাইক্রোবাস চালক মোস্তাফিজুর রহমান। ‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রটির শুটিং লোকেশন দেখতে গিয়েছিলেন তারা। স্থানটি ছিল মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার শালজানা গ্রামের ইছামতী নদীর পাড়। কাজ শেষে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। দুর্ঘটনাটি ঘটে মানিকগঞ্জ শহর থেকে সাত-আট কিলোমিটার পশ্চিমে জোকা এলাকায়। ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চুয়াডাঙ্গাগামী ‘চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স’ (ঢাকা মেট্রো ব ১৪-৪২৮৮) নামক বাসটি বেগতিক গতিতে এসে আঘাত করে তারেক মাসুদসহ অন্যদের বহনকারী মাইক্রোবাসটিকে (ঢাকা মেট্রো চ ১৩-০৩০২)। ঘটনাস্থলেই নিহত হন তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর, প্রডাকশন সহকারী ওয়াসিম, ঘর নির্মাতা জামাল ও মাইক্রোবাস চালক মোস্তাফিজুর রহমান। বাকি তিনজন ক্যাথরিন মাসুদ, শিক্ষক ঢালি আল মামুন, তার স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম জলি আহত হন। 

এ ভয়াবহ দুর্ঘটনার কিছুদিন আগে তারেক মাসুদ স্যার এসেছিলেন আমাদের এলাকায়। তখন স্যারের সঙ্গে আমার দেখা করার ও দুটো কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। দিনটি ছিল ২০১১ সালের ২৯ জুলাই। সেদিন নির্মাতা তারেক মাসুদ স্যারের ছবির প্রদর্শনী ছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে। মিলনায়তনের সবকটি আসন ছিল পূর্ণ। ‘নরসুন্দর’ ও ‘রানওয়ে’ ছবি দুটি দেখতে দেখতে দর্শক এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে চারপাশে কোনো শব্দ ছিল না।

রানওয়ে ছবিটিই ছিল নির্মাতা তারেক মাসুদের সর্বশেষ সৃষ্টিকর্ম। অন্যান্য নির্মাতা সবসময় তাদের ছবি রাজধানীতে মুক্তি দিলেও তারেক মাসুদ স্যার তার সর্বশেষ ছবি রানওয়ে রাজধানীতে প্রথমে মুক্তি দেননি। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় প্রদর্শন করে তারপর তিনি ঢাকায় মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। এ কথাগুলো সেদিন তারেক মাসুদ স্যারের মুখ থেকেই সবাই শুনেছিলেন মুগ্ধ হয়ে। তিনি নিজেকে ‘ছবির ফেরিওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দেন। তারেক মাসুদ স্যার আরো একদিন ময়মনসিংহে আসতে চেয়েছিলেন। সেবার তিনি সঙ্গে আনতে চেয়েছিলেন স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদকেও। কিন্তু সে আশা পূর্ণ হলো না তার।

১৯৮৫ সালে চলচ্চিত্র ‘সোনার বেড়ি’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে নির্মাতা তারেক মাসুদের পথচলা শুরু হয়। এরপর ১৯৮৯ সালে তিনি নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’। শিল্পী এসএম সুলতানের জীবনী নিয়ে তৈরি করেছিলেন এ প্রামাণ্যচিত্রটি। এটি নির্মাণ করতে তার সময় লেগেছিল প্রায় সাত বছর। এরপর তিনি বেশকিছু ডকুমেন্টারি, অ্যানিমেশন ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ আরম্ভ করেন। 

পরবর্তী সময়ে নির্মাতা তারেক মাসুদ আমেরিকার নিউইয়র্কের সেলারে সেলারে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজ সংগ্রহ করেছিলেন। এভাবেই তৈরি করেছিলেন প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’। ১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রামাণ্যচিত্রটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি। দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও প্রামাণ্যচিত্রটি দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৭ সালে ফেস্টিভ্যাল অব সাউথ এশিয়ান ডকুমেন্টারিসে বিশেষ জুরি পুরস্কার অর্জন করে ‘‌মুক্তির গান’। 

১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির কথা’। তারেক মাসুদের ভাবনায় পরিপূর্ণভাবে ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। ২০০২ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’। ছবিটি নির্মাতা তারেক মাসুদের শৈশব সময়ের মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত। এটি বেশকিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। চলচ্চিত্রটির জন্য তিনি ২০০২ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড প্রতিযোগিতায় অফিশিয়াল অস্কার এন্ট্রি, মারাকেশ চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্য পুরস্কার ও কারাফেস্ট করাচি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ২০০৩ সালের সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার লাভ করে। এছাড়া বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন নির্মাতা তারেক মাসুদ। ২০০৬ সালে অন্তর্যাত্রা, ২০০৯ সালে নরসুন্দর ও ২০১০ সালে রানওয়ে নির্মাণ করেন তিনি। তার অন্যান্য সৃষ্টিকর্ম হচ্ছে নারীর কথা, এ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড, ইন দ্য নেম অব সেফটি, ভয়েসেস অব চিলড্রেন, সে ও ইউনিসন।

‘কাগজের ফুল’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল নির্মাতা তারেক মাসুদের। এ চলচ্চিত্রের পটভূমি ছিল ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা, ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৬৬ সালের বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবি। প্রায় এক দশক ধরে এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। নির্মাতা তারেক মাসুদ কাগজের ফুলকে মাটির ময়নার পূর্ববর্তী পর্ব হিসেবে নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তার অবর্তমানে কাগজের ফুল চলচ্চিত্রটি আর নির্মিত হয়ে দর্শকের কাছে এল না।

একটি প্রতিবেদন পড়ে জানলাম যে নির্মাতা তারেক মাসুদ স্যারের বাড়িটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। ২০১১ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর পরই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের দাবির মুখে ও সরকারের আশ্বাসে তার নূরপুর গ্রামের বাড়িসহ কয়েক একর জমি সরকারের ট্রাস্টে দিলেও সেখানে এখনো তৈরি হয়নি কোনো নতুন স্থাপনা। সেখানে রয়েছে যত্নের অপরিসীম অভাব। তারেক মাসুদ স্যারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও বিভিন্ন সময়ে তার হাতে তোলা ছবিগুলো যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ২০১২ সালে নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরকে (মরণোত্তর) একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। আশা করাই যায় তারেক মাসুদ স্যারের বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণে সরকার মনোযোগ দেবে।

তারেক মাসুদ একজন স্বপ্নদ্রষ্টার নাম। তিনি নিজে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন। মানুষকেও স্বপ্ন দেখাতে পারতেন। তিনি ছিলেন ছবির ফেরিওয়ালা। একজন ফেরিওয়ালা যেমন তার ঝুলিতে থাকা জিনিসগুলো ফেরি করে বেড়ায়, তেমনি নির্মাতা তারেক মাসুদও নিজের সৃষ্টিকর্মগুলো নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন চারদিকে, দেশ থেকে দেশান্তরে। ক্ষণজন্মা মানুষটির আরোও অনেক কিছু দেয়ার ছিল এ বিশ্বকে; কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। নির্মম এক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল এ স্বপ্নবাজ মানুষটির প্রাণ। 

দেখতে দেখতে সেই ভয়াল দিনের এক যুগ হয়ে গেল। সময় গড়িয়ে যায়। বেলা ফুরিয়ে যায়। শুধু স্মৃতিটুকু রয়ে যায় মনের কোণায়।