নিজেকে অনেকটা আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন রুসলান রেহমান। তবে তার সঙ্গে দর্শক-শ্রোতার পরিচয় হয়েছে একাধিক মাধ্যমে। ইউটিউবে তার কাপল ব্যান্ড ‘দ্য রেহমান ডুয়ো’ জনপ্রিয়। পাশাপাশি রুসলান সংগীত পরিচালনা করেছেন ‘তাকদীর’, ‘জাগো বাহে’, ‘কারাগার’, ‘অগোচরা’র মতো জনপ্রিয় ওয়েব কনটেন্টে। সংগীতে নিজের যাত্রা নিয়ে রুসলান কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহমুদুর রহমান।
সংগীতে আপনার যাত্রা কীভাবে হলো?
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান করেছিলাম এবং সেখান থেকে ‘সিন্স উই সেপারেট’ নামে একটা সিনেমাও করা হয়। আমার সঙ্গে ছিলেন সুমন সরকার আর আমার বড় ভাই রেদওয়ান রহমান। ওই সিনেমায় আমি সংগীত পরিচালনা করেছিলাম। শুরুটা এ রকমই সিনেমার মাধ্যমে। তবে হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের একটা মেটাল ব্যান্ড ছিল, গ্রিমোরিয়াম ভেরাম। ২০০৯-২০১৩ পর্যন্ত কম্পোজিশন, লাইভে বাজানো হতো। এরপর বন্ধ ছিল অনেকদিন। ২০১৪ সালে আবার মিউজিকে ফেরা।
মাঝখানে আপনি লেখালেখি, মানে চিত্রনাট্য করা বা এ ধরনের কাজেও যুক্ত ছিলেন...
হ্যাঁ, পেশাদারি জীবন বা মিডিয়ায় আমার কাজ মূলত লেখক হিসেবেই শুরু। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন যে সিনেমাটা বানাই, ওটা রবি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওখানে জুরি ছিলেন অমিতাভ রেজা চৌধুরী। এরপর আমি তার সঙ্গে কাজ শুরু করি। আরেকটা প্রজেক্ট হয়, সারফেস নামে। সুমন সরকার ক্যামেরায় ছিল। আমাকে মিউজিকে দিলেন। তখন থেকে সংগীতের জার্নিটা আবার শুরু হয়। আর ওই সময় রুবায়াতের সঙ্গেও আমার পরিচয় হলো। এরপর অনম (বিশ্বাস) ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন বিজ্ঞাপনে জিঙ্গেল দেয়া, ফিকশনে আসা।
ফিকশনে আপনার মিউজিক আমরা শুনছি, তবে আমরা অনেকেই আপনাকে প্রথম চিনি ‘দ্য রেহমান ডুয়ো’র মাধ্যমে। বর্তমানের শ্রোতাদের অন্যতম প্রিয় কাপল ব্যান্ড। এ নিয়ে কিছু বলুন।
রুবায়াতের সঙ্গে পরিচয় হয় ২০১৩ সালের দিকে। ও গাইত। আর আমার কিছু গান লেখা ছিল। ওরও ব্যান্ড ছিল। কিন্তু সেটা নিয়ে ততটা খুশি ছিল না। আর আমিও একটা ব্যান্ড ছেড়ে এসেছি। সেই সূত্রে রুবায়াতই বলে এ গানগুলো নিয়ে কীভাবে এগোনো যায়। আমরা ওই সময় একটা আইরিশ ব্যান্ডের গান শুনতাম। ওখানে মেল অ্যান্ড ফিমেল সিঙ্গার পিয়ানো, গিটার নিয়ে গাইত। ওই আদলে নিজেরা শুরু করি। তবে খুব বেশি মানুষের সামনে না। সারফেস করার পর মনে হলো যে আমাদের গানগুলোর শ্রোতা আছে বা পাওয়া যাবে। ২০১৮ সালে রুবায়াত একটা চ্যানেল খোলে। আর কভিডের সময় আমরা প্রথম অরিজিনালটা করি, অন্বয়। বেশ ভালো সাড়া পাই। তারপর থেকে রেহমান ডুয়ো নিয়ে আরো এগোনো। শুরুটা কভার দিয়ে হলেও এখন আমাদের বেশকিছু অরিজিনালস আছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে আমরা বিয়ে করি। এখন ছয় বছরের সংসার।
কাপল ব্যান্ড, বিজ্ঞাপনে জিঙ্গেল, সিনেমা-সিরিজে সংগীত পরিচালনা। বিজ্ঞাপন আর ফিকশনে কাজ করার ক্ষেত্রে পার্থক্যগুলো কী কী? আর চ্যালেঞ্জগুলোই বা কী?
মূল বিষয়টা টেকনিক্যালিটিতে। বিজ্ঞাপনে ক্লায়েন্টদের নিজস্ব চাহিদা থাকে। একেকটা ব্র্যান্ড একেকটা বার্তা দিতে চায়। কিন্তু সেখানে সময়টা খুব কম। এসব মিলিয়ে বিজ্ঞাপনে কাজ করা কিছুটা কঠিন। আর সেটা অনেক বেশি পেশাদারি। তবে আমার মনে হয় সিনেমায় মিউজিক দেয়ার জন্য একজন সংগীতকারকে আমাদের দেশে বিজ্ঞাপন থেকেই শুরু করতে হয়। কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে বিষয়টা অনেক বেশি নিজস্ব। গভীরে কাজ করে। বিশেষত আমার ক্ষেত্রে।
নির্মাতা হতে চেয়েছিলেন। সিনেমার প্রতি এই ভালোবাসা বা আগ্রহের পেছনের গল্পটা শুনতে চাই।
পেশাদার সংগীতশিল্পী হওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। গল্প, উপন্যাস পড়ার একটা স্বভাব ছিল কলেজ জীবন থেকে। কবিতার নেশাও ছিল। এ সময়ই ইউরোপীয়, ইরানি, লাতিন আমেরিকান সিনেমা দেখা হতো। এ সিনেমা যারা নির্মাণ করতেন, তাদের গল্পও পড়তাম। পড়তে পড়তে একটা আগ্রহ তৈরি হয়। তারপর সে জিনিসটা আসলে আমার ক্ষেত্রে সিনেমায় সংগীত দেয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশ হয়। আর কাজ করতে এসে অনেক নির্মাতার সঙ্গেই বোঝাপড়া হয়েছে। যেমন অমিতাভ ভাই, সৈয়দ শাওকী, অনম বিশ্বাস, আবদুল্লাহ মোহম্মদ সাদের সঙ্গে বিজ্ঞাপন থেকে জার্নি, পরে তাদের ফিকশনেও কাজ করেছি। সংগীত পরিচালক হয়ে ওঠার যাত্রাটা দীর্ঘ।
এ যাত্রা থেকেই তাকদীর থেকে অগোচরা। মাঝে আরো কিছু ফিকশনে সংগীত পরিচালনা করেছেন। যাত্রাটা কেমন?
চমৎকার, এক কথায়। অনম ভাইয়ের কথা তো বললামই। ওনার কাছ থেকে বিজ্ঞাপনের কাজ করার সময় অনেক কিছু শেখা আমার। আর ফিকশনে বড় আকারে কাজের শুরু শাওকীর সঙ্গে। প্রজন্ম টকিজ থেকে এটা শুরু বলা যায়। সে তখন ব্র্যাক থেকে সদ্য পাস করে বেরিয়েছে। আমার সঙ্গে খুব গল্প হতো। এআর রহমান কী করছেন, কিম কি দুক কী করছেন, বাইরের সংগীতের হালচাল কেমন, এসব। তারপর শাওকীই আমাকে একদিন বলল, তাকদিরের মিউজিকটা আমাকে দিয়ে করাতে চায়। করলাম সেটা। এরপর থেকে যাত্রাটা চলল। তাকদীর, জাগো বাহে, কারাগার, গুটি, অগোচরা সর্বশেষ।
সংগীতের ব্যস্ততার মধ্যে আপনাদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মিথোনোমিয়া নিয়ে কীভাবে এগোচ্ছেন?
বেশ ভালোই চলছে এখন। মাঝে একটু থেমে গিয়েছিল। ২০১৯ সালে একটা শর্টফিল্ম হয়েছিল ওখান থেকে, নাম ‘কবিতাটি অসমাপ্ত’। কয়েকটি উৎসবে গিয়েছিল সিনেমাটা। এরপর ইচ্ছা আছে কোনো ওটিটিতে দেব। আর একটা অ্যান্থোলজি করারও পরিকল্পনা চলছে। কয়েকজন নির্মাতাকে নিয়ে কাজ হবে এখানে।
সংগীতে আপনার কাছ থেকে সামনে কী পাচ্ছি?
কয়েকটা কাজের কথা চলছে। খুব বেশি প্রকাশ করা সম্ভব নয় এখন। তবে এর মধ্যে একটা হবে সিনেমায়। সেটা নিয়েই মূলত এখন কথা চলছে। কিছুদিন গেলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাব। আর এর বাইরে রেহমান ডুয়ো তো আছেই।










