অনেকের ছোট বেলার স্বপ্নের নায়ক মাসুদ রানা। দেশ বিদেশে ছুটে বেড়ানো মুক্ত পুরুষ। টান টান উত্তেজনাপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়া অকুতোভয় বাংলাদেশী স্পাই মাসুদ রানাই ছিল বহু কিশোরের অলস দুপুরের একমাত্র সঙ্গী। সে সময় প্রতি মাসে একটা করে মাসুদ রানার বই বের হতো। স্কুলে যাওয়ার রিক্সা ভাড়া বাঁচিয়ে আমরা সেগুলো কিনতাম। দুই বন্ধু মিলে টাকা শেয়ার করেও কেনা হয়েছে। এখনকার প্রজন্ম এ গল্প সেভাবে পড়ে না। তবে চেনে অনেকেই। এত কথা বলার কারণ হলো এ সিরিজের সঙ্গে অনেকেরই আবেগ জড়িত। ছোটবেলার নায়ক বা বাংলাদেশের স্পাই থ্রিলারের জনপ্রিয়তম চরিত্র মাসুদ রানাকে রুপালি পর্দায় দেখার আগ্রহ ছিল সবার। ‘‌এম আর নাইন’ নিয়ে হাইপও ছিল অনেক। বহু রানাভক্ত প্রথম দিনই ছুটে গেছে সিনেমা হলে। কিন্তু সে আগ্রহ ও মাসুদ রানার স্মৃতিকে রীতিমতো ধ্বংস করেছেন এ সিনেমার নির্মাতারা। 

গল্প সংক্ষেপ হিসেবে বলতে হয়, একটি অশুভ শক্তিকে থামাতে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা বিসিআইয়ের সহযোগিতা চায় আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। মাসুদ রানাকে পাঠানো হয় তাদের সহযোগিতা করার জন্য। সিনেমাটি কাজী আনোয়ার হোসেনের লেখা মাসুদ রানা সিরিজের প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়’ অবলম্বনে তৈরি করা। ষাটের দশকের প্লটকে আধুনিকায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেটি করতে গিয়ে গল্পে দেয়া হয়েছে প্রচুর জোড়াতালি। প্লট হোলের সৃষ্টি হয়েছে অনেক। এদিকে মাসুদ রানার সিনেমা হলেও সিআইএ এজেন্টদেরই বেশি কাজ করতে দেখা গেছে। হতাশা তৈরি হয় এখানেই।

গল্পের বাইরে সিনেমায় এলে বলতে হয় কলাকুশলীদের অভিনয়, ডায়ালগ, স্টোরি টেলিং, সিনেমাটোগ্রাফি, এডিটিং, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, ভিএফএক্স, কালার গ্রেডিং এমনকি অ্যাকশন সিনগুলো পর্যন্ত হতাশাজনক। সিনেমাটির প্রযোজক দাবি করেছেন এম আর নাইন বানাতে তাদের ৮০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু সিনেমাটি দেখে প্রশ্ন জাগে টাকাগুলো আসলে খরচ হয়েছে কোথায়। একটা অ্যাকশন মুভির মূল আকর্ষণ এর টান টান উত্তেজনায়। অ্যাকশন দৃশ্যে থাকার কথা অ্যাডরেনালিন রাশ। এসবের কিছুই নির্মাতারা দিতে পারেননি। অভিনয়ের অবস্থাও তথৈবচ।

আশা ছিল অনেক, কিন্তু এ সিনেমার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে দুই হাজার-পরবর্তী বি-গ্রেড বাংলা অ্যাকশন সিনেমাগুলোর সঙ্গে। সত্যি বলতে, ওইসব সিনেমার সংলাপ কিংবা অ্যাকশনও অনেক ক্ষেত্রে এ তথাকথিত হলিউডি সিনেমার চেয়ে উন্নত। মাসুদ রানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন সুদর্শন অভিনেতা এবিএম সুমন। হলিউডের কয়েকজন পরিচিত মুখও এ সিনেমায় কাজ করেছেন। তাদের নিয়ে অনেক কিছু করার সুযোগ থাকলেও পরিচালক কোনো কিছুতেই দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি। কাস্টিং সঠিক হয়নি। মেজর জেনারেল রাহাত খানের চরিত্রে শহিদুল আলম সাচ্চুকে একদমই মানায়নি। পুরান ঢাকায় একটা দৌড়ের দৃশ্য ছাড়া পুরো সিনেমায় ফোন ধরা ছাড়া কোনো কাজ ছিল না আলিশা ও জেসিয়ার। আনিসুর রহমান মিলনও ওভারঅ্যাক্টিং করেছেন। বই অনুসারে তার চরিত্রটি ভীতিকর। সিনেমায় লাগল হাস্যকর। বইয়ে মাসুদ রানার আইডেন্টিটি একটা সিক্রেট। সিনেমায় দেখা গেল সবাই তাকে এম আর নাইন বলে ডাকছে, সে নিজেও যেখানে সেখানে গিয়ে সরাসরি জানিয়ে দিচ্ছে সে বিসিআই এর স্পাই!

বইয়ের সঙ্গে তুলনা না করেও সিনেমার দুর্বলতা দেখা যায়। বিশেষত আজকের দিনে সিনেমা নির্মাণে সতর্ক হওয়া দরকার। কেননা পৃথিবীর জনপ্রিয় অ্যাকশন সিনেমাগুলো এখন হলে, নেটফ্লিক্সে, নিয়মিতই দেখে আমাদের দর্শক। সেসব সিনেমার বাজেট বেশি, কিন্তু এর চেয়ে অনেক কম বাজেটেও বাংলাদেশে এর চেয়ে অনেক ভালো কাহিনী, অ্যাকশন, ভিএফএক্স নিয়ে ভালো সিনেমা এরই মধ্যে নির্মিত হয়েছে। এম আর নাইন যে মানের সিনেমা, সে মানের সিনেমার দিন এখন আর নেই। 

মাসুদ রানাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাতাদের একটি সুবিধা ছিল। জনপ্রিয় চরিত্র রুপালি পর্দায় আসার কারণে এর দর্শক সহজেই পাওয়া যায়। তবে দায়িত্বও বেশি ছিল। কিন্তু এম আর নাইন দেখে দর্শকের হাসিও পাবে না। সিনেমার ৯০ ভাগ কথোপকথন ইংরেজিতে। দর্শকদের সুবিধার্থে বাংলা সাবটাইটেল দেয়া ছিল, কিন্তু সে সাবটাইটেলে পর্যন্ত বানান ভুল। এ রকম বেখেয়ালিপনা, অযত্নের ছাপ সিনেমার সর্বত্র। শুধু একটা বিষয়ে এর প্রযোজক পরিচালকরা বাহ্বা পেতে পারেন, উপমহাদেশীয় কমার্সিয়াল সিনেমার কমন রীতি, সিনেমায় একটা আইটেম সং রাখা কিংবা রোমান্টিক গানে নায়ক-নায়িকার নাচ বা এমন দৃশ্য সিনেমায় রাখা হয়নি। 

শুরু থেকে মাসুদ রানা সিনেমা নিয়ে নানা পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়েছে। এবিএম সুমন যুক্ত হওয়ার পর দর্শক ভেবেছিল, তাদের প্রিয় নায়কের প্রতি সুবিচার করা হবে। কিন্তু নির্মাতারা তা পারেননি। সব মিলিয়ে এটুকুই বলা যায়, পুরো সিনেমা একটি বড় ব্যর্থতা।