এবার শত্রু রক্ত-মাংসের কোনো মানুষ নয়। চৌকস এজেন্টের মুখোমুখি এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ‘দি এনটিটি’ নামেই তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। মানুষের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একপর্যায়ে মানুষের নাগালের বাইরে গিয়ে মানুষের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে হুমকির মোকাবেলা মানুষকেই করতে হবে। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে তো আর তা সম্ভব নয়। কারণ কৃত্রিমভাবে তৈরি হলেও দি এনটিটির নিজস্ব বিচার-বিবেচনা আছে। আর সেই বুদ্ধিমত্তার গতি ও প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা গড়পড়তা মানুষের নেই। এমনকি বিশ্বের বড় বড় স্পাই এজেন্সির বাঘা বাঘা এজেন্টও এ নতুন শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস করতে পারছেন না। দি এনটিটির তাণ্ডবলীলা ঠেকানো আপাত দৃষ্টিতে ‘ইমপসিবল’। এ অসাধ্য সাধন করতে এমন কাউকে প্রয়োজন, যার একই সঙ্গে ক্ষুরধার বুদ্ধি, ক্ষীপ্র গতি ও অবলীলায় মৃত্যুকে অবহেলা করার ক্ষমতা আছে। আর এমন তো একজনই আছেন। এফবিআই, সিআইএসহ সবাই যখন হাত গুটিয়ে নেয়, তখন কেবল একজনের দপ্তরই তো খোলা থাকে। আইএমএফ তথা ইমপসিবল মিশন ফোর্সের এজেন্ট ইথান হান্ট। মিশন ইমপসিবল ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রতিটি মিশনে ইথান হান্টই তার দল নিয়ে সম্ভাব্য সব বিপর্যয় ঠেকিয়ে দিয়েছেন।
মিশন ইমপসিবল সিরিজের সপ্তম কিস্তি ‘মিশন ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান। সিনেমাটি দেখতে গিয়ে দর্শক হিসেবে প্রথমেই যে বিষয় আকর্ষণ করে, তা হলো সিনেমার গল্পের অভিনবত্ব। বর্তমানে সারা বিশ্বের আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এর ভবিষ্যৎ কী, এটি মানুষের সহযোগী হবে না প্রতিযোগী হবে, একে নিয়ন্ত্রণ করে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করা যায় ইত্যাদি আলোচনায় তোলপাড় সারা দুনিয়া। বর্তমান বিশ্বের আলোচ্য এমন হট টপিককে কেন্দ্র করে এত চমৎকার গল্প নির্মাণ ও পর্দায় তার সার্থক উপস্থাপন মিশন ইমপসিবল ফ্র্যাঞ্চাইজির পক্ষেই সম্ভব। সিনেমায় দেখানো হয় দি এনটিটিকে। ডিজিটাল দুনিয়ার সবকিছু তার নখদর্পণে। বর্তমান দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্য। যে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের দখলে যত বেশি তথ্য থাকবে, তারা অন্যদের ওপর তত বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। আর দি এনটিটির চেয়ে বেশি তথ্য আর কারো জানা নেই। সাধারণ মানুষ থেকে রাষ্ট্রপ্রধান, প্রত্যেকের খুঁটিনাটি জানে সে। আর এ জানা তাকে করেছে অনন্য শক্তির আধার। এ বিপুল ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে একটি চাবির সাহায্যে। আর তাই সে চাবির দখল নিতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো। একমাত্র ব্যতিক্রম ইথান হান্ট। আইএমএফের এ এজেন্ট দি এনটিটির নিয়ন্ত্রক হতে দিতে চান না কাউকে। কারণ তিনি জানেন, এ ক্ষমতার চাবি মানুষের হাতে এলে, সহজাত মানবপ্রবৃত্তির বশে তারা ব্যাপক ধ্বংসলীলায় মেতে উঠবে। তাই দি এনটিটিকে ধ্বংস করে দিতে চান ইথান হান্ট। আবার নিজের অ্যালগরিদম প্রয়োগ করে দি এনটিটিও বুঝতে পেরেছে যেকোনো এক প্রব্যাবিলিটিতে ইথান হান্টের হাতে সে ধ্বংস হবে। আর তাই নিজেকে রক্ষার প্রস্তুতি নেয় সে। তার পাশে বিশ্বস্ত সেনা হিসেবে থাকে গ্যাব্রিয়েল। ইথান হান্ট ও দি এনটিটির এ যুদ্ধে কে জয়ী হবে, সে উত্তর অবশ্য ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ানে পাবে না দর্শক। তার জন্য পার্ট টু মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এ সিনেমায় দর্শককে দার্শনিক প্রশ্নের মুখোমুখি করে দিয়েছেন পরিচালক ক্রিস্টোফার ম্যাকুয়ের ও তার দল। মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুদ্ধে শেষ হাসি হাসবে কে? মানুষ কি আদৌ তার নিজের সৃষ্টির রাশ টেনে ধরে নিজের প্রয়োজনে তাকে খাটাতে পারবে, নাকি তা বল্গাহীন ঘোড়ার মতো তার আরোহীকেই পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে মাটিতে পিষ্ট করবে? এসব ভাবতে ভাবতেই দর্শক মিশন ইমপসিবল ফ্র্যাঞ্চাইজির চিরাচরিত অ্যাকশন দৃশ্য ও রোমহর্ষক স্টান্টে বিমোহিত হবে। ইথান হান্টের পাহাড়ের ওপর থেকে মোটরসাইকেলে চড়ে লাফ দেয়ার দৃশ্য নিশ্চিতভাবে দর্শকদের ঘুমের মধ্যেও তাড়িত করবে।
ইথান হান্ট চরিত্রে বরাবরের মতোই সাবলীল হলিউডের সুপারস্টার টম ক্রুজ। তার দুরন্ত গতি, দুর্দান্ত স্টান্ট ও সাবলীল অ্যাকশন দেখে দর্শক ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না যে তার বয়স ৬১ বছর! প্রতি মুহূর্তে মনে হবে কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানার মতো তার বয়স ২৮-এই আটকে আছে। সিনেমার প্রধান আকর্ষণ টম ক্রুজ হলেও হেইলি অ্যাটওয়েল, রেবেকা ফার্গুসন, ভিং র্যামেস, সাইমন পেগ, ইসাই মরালেস ও ভ্যানেসা কার্বির মতো অভিনেতারা নিজ গুণে দর্শকদের নজর কেড়েছেন।
মিশন ইমপসিবল ফ্র্যাঞ্চাইজির আগের সিনেমাগুলোর মতো ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ানও টানটান উত্তেজনায় ভরপুর। তবে এর মূল অভিনবত্ব তার গল্পে। মিশন ইমপসিবলের মতো মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে এমন গল্প নিঃসন্দেহে অকৃত্রিম প্রশংসার দাবিদার।










