সিনেমা বাস্তবের প্রতিচ্ছবি হবে, না একটা কাল্পনিক দুনিয়া দেখাবে, তা নিয়ে তর্ক বহু পুরাতন। সিনেমা অবশ্যই শিল্প, কিন্তু সে শিল্পমাধ্যমে বীভৎসতা থাকবে না, এমন কথা আধুনিক নির্মাতা, অভিনেতা এমনকি দর্শকও মানেন না। সিনেমায় সহিংসতা এসেছে বহু আগে থেকেই। হরর সিনেমা শুরু হওয়ার পর তাতে যুক্ত হয় নানা বীভৎস দৃশ্য, তত্ত্ব ও উপস্থাপনা। ক্যানিবালিজমও বাদ পড়েনি সেখান থেকে। এরপর হরর সিনেমার বাইরেও ক্যানিবালিজম এসেছে সিনেমায়। সম্প্রতি বিষয়টি আরো বিস্তৃত পরিসরে আসতে শুরু করেছে। এখানেই শেষ নয়। একটা সময় একে দেখানো হতো নেতিবাচকভাবে। এখন কোনো কোনো সিনেমায় বিষয়টি আসে ইতিবাচক হিসেবে। ইতিবাচক না হলেও অন্তত নেতিবাচকভাবে দেখানো হয় না। উল্টো দর্শকরা এ ধরনের বিষয় পর্দায় দেখতে পছন্দ করেন।

গত নভেম্বরের শেষে মুক্তি পেয়েছে টিমোথি শ্যালামে অভিনীত বোনস অ্যান্ড অল। কমিক থ্রিলার জনরার সিনেমা দ্য মেনু, নেটফ্লিক্স এনেছিল দ্য জেফ্রি ড্যামার স্টোরি। জানুয়ারিতে আসা ক্যানিবাল স্টোরি দ্য ফ্ল্যাশও দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছিল। প্রশ্ন ওঠে সিনেমাগুলো কেন এত দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে? এ প্রসঙ্গে দ্য হলিউড রিপোর্টার থেকে লং আইল্যান্ড ইউনিভার্সিটির বায়োলজির ইমেরিটাস প্রফেসর বিল শুটের সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়েছে। এ সাক্ষাৎকারে তিনি ক্যানিবালিজম, সিনেমা ও বইয়ে এর উপস্থিতি এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রকৃতিতে ক্যানিবালিজম একটি স্বাভাবিক বিষয়। বিভিন্ন প্রাণী এদের তরুণ বয়সীদের খেয়ে ফেলে। তাদের সমাজে এটাই বেঁচে থাকার নিয়ম।

মানব সমাজ বা মানুষের মধ্যে নিজ প্রজাতিকে ভক্ষণ করার ব্যাপারটির স্বাভাবিকতা নিয়ে তার মত হলো ব্যাপারটি মূলত কোনো একটি সমাজ বা অঞ্চলের সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে। তার ভাষায়, ‘‌‌মানু্ষই একমাত্র প্রজাতি, যারা বুদ্ধিবৃত্তি থেকে ঠিক করে কোন কাজটা সঠিক আর কোন কাজটা ভুল। সেখান থেকে সমাজে তৈরি হয় ট্যাবু।’ বিল শুটের কথার অর্থ করা যায় যে ট্যাবুর বিষয়গুলো সমাজ নিষিদ্ধ করার ফলে তা সিনেমায় উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু ট্যাবু বলেই তা সিনেমায় উপস্থাপন করা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা উচিত। কেননা ট্যাবু তো বিশ্বময় একটি নয়। তাহলে এ নির্দিষ্ট বিষয়েই কেন এত সিনেমা হচ্ছে আর তাও এত কম সময়ে?

মূলত কম সময়ের মধ্যে নয়। সিনেমায় ক্যানিবালিজম নিয়ে আসা হয়েছে বেশ আগেই। ১৯৬৮ সালের বোনি অ্যান্ড ক্লাইডের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো এমনভাবে সামনে আসে, যা দর্শককে আকর্ষণ করে। একটা সময় ছিল যখন ভ্যাম্পায়ার নিয়ে সিনেমা মানুষকে আকর্ষণ করত। এরপর ক্যানিবালিজম আসার মাধ্যমে নতুন একটি ধারা পেয়ে যায় দর্শক। ক্রমে সিনেমার দর্শক ধরা ও ব্যবসা বাড়ানোর জন্য বিষয়টিকে চিত্তাকর্ষক করে তোলেন প্রযোজক ও নির্মাতারা। আশি-নব্বইয়ের দশকে হরর ও অ্যাকশন সিনেমার ছায়ায় পড়ে গিয়েছিল ধারাটি। এ শতকে এসে আবার সিনেমায় ক্যানিবালিজম ফিরে আসে। ২০১৩ সালের হ্যানিবাল এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এ সিরিজের আইএমডিবি রেটিং ৮ দশমিক ৫ ও বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়।

হলিউডের ধারায় বাংলাদেশেও এ ধারার সিনেমা, নাটক, সিরিজ নির্মিত ও জনপ্রিয় হচ্ছে। এর মধ্যে ভিকি জাহেদের পুনর্জন্ম ও মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনের বই থেকে সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেনি প্রধান। এ ধরনের সিনেমার প্রভাব সমাজে কেমন, তা নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক উঠেছে। কেননা ক্যানিবালিজম কিংবা সহিংসতাকে একটা সময়ে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে দেখানো হতো। বর্তমানে তা রোমান্টিক ও ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়। তাই এ ধারার কনটেন্ট নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, এর সামাজিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

দ্য হলিউড রিপোর্টার অবলম্বনে আসরার আবেদিন