সাইবার অপরাধ শনাক্ত করা যতটা কঠিন,
তার চেয়েও কঠিন প্রমাণ করা। এই অস্পষ্ট ও অদৃশ্য অপরাধীদের ধরতে প্রয়োজন বিজ্ঞানের
বিশেষায়িত জ্ঞান। সব মিলিয়ে ভিজ্যুয়ালি তুলে ধরা আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং। যার একটি মিশেল
দেখা গেল ‘বিলিয়ন ডলার হেইস্ট’ শিরোনামের ডকুমেন্টারিতে।
সাইবার অ্যাটাক এমন একটি বিষয়; যার
ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়তে পারে পারমাণবিক প্ল্যান্ট থেকে হাসপাতাল বা জ্বালানি পাইপলাইনে।
রাতারাতি খালি হয়ে যেতে পারে ব্যাংক। ২০১৬ সালে এমন ঘটনার শিকার হয় বাংলাদেশ। হ্যাকিংয়ের
মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে চুরি যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ।
সেই চুরির ঘটনা তুলে ধরেছে ‘বিলিয়ন ডলার হেইস্ট’।
ওই সময় অভিনব এ হ্যাকিং পুরো বিশ্বের
ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিরাপত্তাকে বড় ঝাঁকুনি দিয়েছিল। এ কারণে শুধু চলচ্চিত্রের মজ্জাগত
থ্রিল নয়, সাইবারের রমরমা যুগে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি তুলে ধরার ক্ষেত্রে তথ্যচিত্রটির
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে; এ কথা আগাম বলে দেয়া যায়।
হলিউডের ইউনিভার্সাল পিকচার্স হোম এন্টারটেইনমেন্ট
নির্মিত এ তথ্যচিত্র নিয়ে বাংলাদেশে কিছুদিন ধরে আলোচনা হচ্ছিল। আলোচিত ট্রেলারের পর
সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে আমাজন প্রাইম ভিডিও ও অ্যাপল টিভি প্লাসসহ একাধিক বৈশ্বিক ওটিটি
প্লাটফর্মে।
তথ্যচিত্রটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন
ড্যানিয়েল গর্ডন, ব্রেন্ডন ডনোভান ও ব্রায়ান ইভানস। বিভিন্ন ভূমিকায় আছেন মিশা গ্লেনি,
মিকো হিপ্পোনেন, কৃষ্ণা দাস, রাকেশ আস্তানা ও রাফাল রহোজিনস্কিসহ অনেকে।
দ্য গার্ডিয়ানের এক রিভিউতে পাঁচ তারকার
মাঝে তিন পেয়েছে ‘বিলিয়ন ডলার হেইস্ট’। পূর্ণদৈর্ঘ্যের এ ডকুমেন্টারিকে তথ্যপূর্ণ বিনোদনে
পরিণত করার চ্যালেঞ্জ ছিল বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়। ড্যানিয়েল গর্ডন বিভিন্ন দেশ,
টাইম জোন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত সাইবার অপরাধকে তুল ধরতে সিনেমাটিক নানা
কৌশল ব্যবহার করেন। অ্যানিমেশন, নাটকীয়তা, বিভিন্ন ধরনের স্টক ফুটেজ ও আর্কাইভাল ফুটেজসহ
ধারাভাষ্যকার যোগ করেছেন। এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা ও সাইবার অপরাধীর মতো চরিত্র।
চলচ্চিত্রে র্যানসমওয়্যার আক্রমণের
ইতিহাস ও এর কার্যকারিতা নিয়ে বর্ণনা রয়েছে। যেভাবে দর্শকের বোধগম্য করতে হলিউডের
‘মাঝারি ধরনের বিনোদনমূলক ছবি’ তৈরি হয় সে পথে হেঁটেছেন নির্মারা। যেভাবে ওই ইন্ডাস্ট্রি
তৈরি করেছে বড় বড় বাজেটের সিনেমা। কিন্তু ‘বিলিয়ন ডলার হেইস্ট’ বলছে এসব অপরাধ এখন
আর কল্পনা নয়। এটাও মনে করিয়ে দেয়, র্যানসমওয়্যারের ক্ষতি হলিউড নিজেও বুঝতে পেরেছে
কয়েক বছর আগে। ওই সময় খোদ সনি পিকচার্সের সার্ভার থেকে চুরি হয়ে যায় সিনেমা। মুক্তির
আগেই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
কীভাবে অজানা হ্যাকাররা ফিশিং ইমেইলের
মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশী কর্মচারীকে বেছে নিয়েছিল; কীভাবে তারা কম্পিউটার
থেকে কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ে; কীভাবে তিনটি ভিন্ন দেশের জাতীয় ছুটির দিন ও
সপ্তাহান্ত মিলিয়ে পরিকল্পনা করে তার অনেকটা উঠে এসেছে এ তথ্যচিত্রে। হ্যাকারদের জন্য
‘দুর্ভাগ্যজনক’ভাবে একটি টাইপো কীভাবে এক বিলিয়নকে মাত্র ১০১ মিলিয়ন ডলারে সীমাবদ্ধ
রেখেছিল ও কীভাবে চোররা একটি ফিলিপিনো ক্যাসিনোতে ৮১ মিলিয়ন ডলার হস্তান্তর করে বর্ণনা
আছে। আর প্রতিটি পর্যায়ে থ্রিলারের স্বাদ দিতে চেয়েছেন নির্মাতা। সামান্য লেখার ত্রুটিতে
অর্থ হারানো ঘটনা এ তথ্যচিত্রে কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি করে। অবশ্য অতিনাটকীয় হলেও বাস্তব
ঘটনা এমন ঘটায় আসলে পরিচালকের করার কিছু থাকে না।
হ্যাকাররা মূলত সংক্ষেপে ‘সুইফট’ নামে
পরিচিত সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা
ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল। যার সঙ্গে বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা জড়িত। এ দিকটি ব্যাখ্যা
করে ‘বিলিয়ন ডলার হেইস্ট’ বৈশ্বিক আন্তঃব্যাংক ব্যবস্থার ঝুঁকি তুমুলভাবে দৃশ্যমান
করেছে। ওই ঘটনার পর সারা বিশ্বে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা উচ্চ সতর্কাবস্থায় চলে
যান। তারও বর্ণনা আছে সিনেমায়।
অবশ্য মিশা গ্লেনি আরো কিছু ঝুঁকির
কথা তুলে ধরেছেন। কিছুটা নাটকীয় স্বরে এলেও মহামারী, গণবিধ্বংসী অস্ত্র, জলবায়ু পরিবর্তন
ও সাইবার মানব অস্তিুত্বের যে ঝুঁকি তৈরি করেছে তা মোকাবেলা ছাড়া আমাদের সামনে কোনো
পথ নেই। সেটিও মানতে হবে।










