একটি সিনেমার সাফল্য অনেকগুলো মাপকাঠির ওপর নির্ভর করে। তবে বর্তমানে প্রধান মাপকাঠি ধরা হয় বক্স অফিসের আয়কে। একসময় বলিউডের হিট সিনেমাগুলোকে জুবিলি, সিলভার জুবিলি ও গোল্ডেন জুবিলি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হতো। কোনো সিনেমা টানা কয়েক সপ্তাহ থিয়েটারে হাউজফুল থাকলে তা জুবিলি হিসেবে পরিচিতি পেত। সময়ের সঙ্গে এসব পরিবর্তন হয়। সিনেমাগুলো তখন হিট, সুপারহিট ও ব্লকবাস্টার হিসেবে পরিচিত হতে থাকে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হতো। প্রথমত, সিনেমার টিকিট বিক্রির পরিমাণ। দ্বিতীয়ত, থিয়েটারে কত সময় ধরে চলছে। বর্তমানে সিনেমাটি কত শতকোটি ক্লাব অর্জন করেছে, সে হিসেবে সাফল্য বিবেচনা করা হয়।

এভাবেই যুগে যুগে সিনেমার সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে দর্শকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়েছে। তবে কি শত কোটি আয় করা সব সিনেমাই ভালো? অন্যদিকে প্রথমদিনই ভালো করতে না পারা সব সিনেমাই কি তবে খারাপ? বক্স অফিসের আয়ের অংকই কি একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়? এ নিয়ে বলিউডে জমে উঠেছে বিতর্ক। কয়েকদিন আগে এক দর্শক টুইটারে বক্স অফিসের দেখানো আয়ের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিভিন্ন ব্যবসায়িক সূত্র ও প্রযোজকদের দেয়া পরিসংখ্যানের মধ্যে অসংগতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। এর জবাব দেন নির্মাতা হানসাল মেহতা। বক্স অফিস দিয়ে কোনো সিনেমাকে যাচাই করা উচিত নয় বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘বক্স অফিস নিয়ে দর্শকদের মাথাব্যথা থাকা ঠিক নয়। সিনেমা নির্মাণে বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানই কেবল বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করবে। বক্স অফিসের আয় দিয়ে সিনেমার সাফল্য নির্ধারণ করা বন্ধ করুন। বাজে সিনেমাও অনেক সময় প্রচুর আয় করে। অন্যদিকে ভালো সিনেমাও কম আয় করতে পারে। সিনেমাটি দেখে আপনার কেমন লেগেছে, তা দিয়ে এর বিবেচনা করুন। সিনেমার আয় দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার টিকিটের দাম উসুল হয়েছে কিনা তা নিয়ে ভাবুন। অভিনেতার পারিশ্রমিক নিয়ে চিন্তা করা অপ্রয়োজনীয়।’

তবে দর্শকদের এমন মনোভাবের ব্যাপারে হানসাল মেহতার মতো অতটা কঠোর নন কমল নাহতা। দর্শকদের এমন মানসিকতাকে সহজে পরিবর্তন করা যাবে না বলে জানান এ বলিউড বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘সংখ্যা নিয়ে দর্শকদের উন্মাদনা আছে। ১০-১৫ বছর ধরে তারা সংখ্যা নিয়ে কথা বলছে। তবে, আদর্শগত দিক দিয়ে হানসাল মেহতা সঠিক কথাই বলেছেন।’

বক্স অফিসে ভালো আয় করা মানেই ভালো সিনেমা নয়। এ ব্যাপারে হানসাল মেহতার সঙ্গে একমত আরেক নির্মাতা চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদী। তিনি বলেন, ‘সিনেমার বাজার এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, বক্স অফিসে সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাই যেন সবচেয়ে ভালো সিনেমা। আমি এর সঙ্গে একমত নই। বক্স অফিসই যদি ভালো সিনেমার নির্ণায়ক হয়, তাহলে কম আয় করা ভালো সিনেমাগুলোর কোনো অবস্থানই থাকে না। এটি একটি বাজার। মিডিয়া মানুষকে বক্স অফিসে অভ্যস্ত করেছে। এমনকি শিশুরাও এখন সিনেমার বক্স অফিস কালেকশন সম্পর্কে জানতে চায়। প্রায় দেখা যায়, অত্যন্ত বাজে সিনেমাও বক্স অফিসে ভালো আয় করে।’

ভালো রিভিউ নাকি বক্স অফিসের ভালো আয়? একটি সিনেমা দেখার উপযোগী কী না তার প্রকৃত নির্দেশক কোনটি? এ নিয়েও চলছে বিতর্ক। তবে সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে কোনোটিকেই গুরুত্ব

দিতে নারাজ চন্দ্রপ্রকাশ। তিনি বলেন, ‘সিনেমা দেখার জন্য আমি কখনো রিভিউ পড়তাম না। আর তখন রিভিউ প্রকাশও হতো না। যদি মনোজ কুমার কোনো সিনেমা বানাতেন, আমরা বিশ্বাস করতাম, তিনি অবশ্যই ভালো সিনেমা বানিয়েছেন। রাজশ্রী প্রডাকশনসের সিনেমার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ছিল। আমরা ভালো-খারাপ সব ধরনের সিনেমাই দেখতাম। আমরা কখনো বক্স অফিসের দিকে তাকাতাম না।’ রিভিউ ও মূল্যায়নকে বর্তমানের একটি ফ্যাশন বলে তিনি অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মানুষ সিনেমা হলে যাওয়ার আগে রিভিউ পড়ে। নিঃসন্দেহে এটি তাদের অধিকার। কিন্ত সব রিভিউ যে যথাযথ হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।’

তবে সিনেমার জগৎকে কেন্দ্র করে দর্শকদের মানসিকতা কীভাবে পরিবর্তন হয়েছ, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুকেশ ভাট। তিনি বলেন, ‘আগে সিনেমাই ছিল বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। তখন কোনো টিভি, ভিএইচএস বা ওটিটি ছিল না। সে কারণে সিনেমা অনেক সপ্তাহ ধরে হলে চলত। আগে কোনো পাইরেসিও ছিল না। বর্তমানে প্রযুক্তির কারণে অনেক বিকল্প সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় একটি সিনেমা মুক্তি দিতে হয়।’

এ বিতর্কে বলিউডের কয়েকজন অভিনেতাও অংশ নিয়েছেন। বক্স অফিসের আয় দিয়ে সিনেমাকে মূল্যায়ন করার বিরোধী মনোজ বাজপেয়ী। তিনি বলেন, ‘আমি আগে দক্ষিণী সিনেমায় কাজ করেছি। আমি সবসময় ভালো গল্প খুঁজেছি। সিনেমাটি কত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে আমি কখনো সেটা দেখিনি। আমি এভাবে কাজ করি না। এখন সবাই শুধু বক্স অফিস নিয়ে কথা বলতে চায়। বক্স অফিসের ট্রেন্ডের বিরুদ্ধে আমি শুরু থেকেই কথা বলছি।’ নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিও একই ধারণা পোষণ করেন। তার মতে, সিনেমা নির্মাণে বাজেটের চেয়েও একটি ভালো গল্প বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

টাইমস অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত রচিত গুপ্ত ও ভারতী দুবের বিশ্লেষণ অবলম্বনে