আজ বিখ্যাত মরমি সাধক হাসন রাজার ৯৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। অনেকটা নীরবেই কাটছে হাসন রাজার মৃত্যুবার্ষিকী। হাওড়-বাঁওড়ের জেলা সুনামগঞ্জ ‘হাসন রাজার দেশ’
নামেই পরিচিত। প্রতি বছর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, মরমি গীতিকবি দুর্বিণ শাহর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। অন্যদিকে সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবে ধ্বংসের পথে রাজার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি। মরমি এ সাধকের জীবন ও দর্শন কিংবা তার গানের চর্চা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এখানে হয় না বললেই চলে।
এদিকে করোনার কারণে বন্ধ হয় হাসন রাজা মিউজিয়াম। পরে চার দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তালা ঝুলে আছে হাসন রাজা মিউজিয়ামে। সরকারি বা পারিবারিকভাবে এটি সংস্কার কিংবা সংরক্ষণের কোনো উদ্যেগ এখনো চোখে পড়েনি। মিউজিয়ামের তালা ঝুলতে দেখে হতাশ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
‘লোকে বলে বলেরে ঘর-বাড়ী ভালা না আমার/ কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝার/ লোকে বলে বলেরে ঘর-বাড়ী ভালা না আমার’—মৃত্যুর আগেই এ গানের মধ্যে মরমি কবি হাসন রাজা বলে গেছেন তার ঘর-বাড়ির অবস্থা ভালো নয়। সেই গানের কথা আজ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এই মরমি কবির সেই স্মৃতিবিজড়িত ঘরটিও আজ ধ্বংসের পথে। নেই সংস্কারের উদ্যোগ।
বিখ্যাত মরমি কবি হাসন রাজা ১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর (৭ পৌষ ১২৬১) সুনামগঞ্জ শহরের নিকটবর্তী সুরমা নদীর তীরে লক্ষ্মণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রামে ধনাঢ্য জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, রামপাশা, লক্ষ্মণশ্রী আর সিলেটের একাংশ নিয়ে পাঁচ লাখ বিঘার বিশাল অঞ্চলের জমিদার ছিলেন। পিতা ও মাতা উভয়ের কাছ থেকে পাওয়া বিশাল জমিদারির মালিকানা তার হাতে চলে আসে কিশোর বয়সে। বেহিসাবি সম্পদ আর ক্ষমতার দাপটে বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। জাগতিক লোভ-লালসা, ক্ষমতায়ন, জবরদখল করেও তার প্রতিপত্তি বাড়ানোর কাজে প্রবৃত্ত ছিলেন এ প্রবল পরাক্রমশালী জমিদার। কিন্তু একসময় তার ভেতরের ভ্রান্তি ঘুচে যায়। তিনি তার সম্পদ জনকল্যাণের জন্য উইল করে দিয়ে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে হাওড়ে হাওড়ে ভাসতে থাকেন। সৃষ্টিকর্তার প্রেমে পাগল হাসন রাজা সেই সময় থেকেই নিজের লেখা গান গেয়ে বিখ্যাত হয়েছেন দেশে-বিদেশে। হাসন রাজার গানের মাঝে অন্তর্নিহিত রয়েছে নশ্বর জীবন এবং নিজের কৃত কর্মের প্রতি অপরাধবোধের কথা। ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তার রচিত ২০৬টি গান নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। সংকলনটির নাম ছিল ‘হাসন উদাস’। ১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জ শহরের লক্ষ্মণশ্রীতে মায়ের কবরের পাশে কবর দেয়া হয় তাকে। তার এ কবরখানা তিনি মৃত্যুর আগে নিজেই প্রস্তুত করেছিলেন। মরমি এ সাধকের সৃষ্টিকর্ম ধরে রাখার জন্য সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
হাসন রাজার বাড়িতে ঘুরতে আসা নাসিম খান এ প্রতিবেদককে জানান, হাসন রাজার বাড়ির মিউজিয়ামটি বন্ধ। অযত্ন-অবহেলায় হাসন রাজার বাড়িটি আগামী দু-এক বছরে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পর্যটকদের আকর্ষণ হাসন রাজার বাড়িটিকে সংরক্ষণের দাবি জানান তিনি।
সিলেট থেকে আসা আরেক পর্যটক লুত্ফুর রহমান জানান, গানে শুনেছি সুরমা নদীর পাড়ে হাসন রাজার বাড়ি। আজ বাস্তবে দেখলাম। তবে হাসন রাজার বাড়িটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। এভাবে হাসন রাজার স্মৃতিগুলো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
হাসন রাজার প্রপৌত্র দেওয়ান গণিউল সালাদীন বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় লালন সাইজির আখড়ায় মিলনমেলা হয়। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, দুর্বিণ শাহসহ সবার জন্ম-মৃত্যুবাষির্কী সরকারি উদ্যোগে পালিত হয়। কিন্তু হাসন রাজার বেলায় পালন করা হয় না। হাসন রাজাকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে সরকারি উদ্যোগের দাবি জানাই।
হাসন রাজার প্রপৌত্র ও হাসন রাজা গবেষক সামারীন দেওয়ান বলেন, হাসন রাজা জাদুঘরটি করোনার কারণে মার্চ থেকে বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাসন রাজার স্মৃতি ও মিউজিয়াম দেখতে অসংখ্য দর্শনার্থী আসেন, কিন্তু সেটি বন্ধ পেয়ে তারা বেদনা নিয়ে ফিরে যায়। মিউজিয়ামটি সংস্কাররের জন্য জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা অনুদান দেয়া হয়। কিন্তু মিউজিয়ামটি অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চালু করতে পারিনি। পাশাপাশি হাসন রাজাকে নিয়ে সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে হাসন রাজাকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা যেত।
তিনি আরো বলেন, হাসন রাজার জন্মভিটা সেই বাড়িটি পবিবারের পক্ষ থেকে সংরক্ষণ করে আসছিলাম। কিন্তু এখন বাড়িটি সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। আমাদের দাবি প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হোক। এবার হাসন রাজার ৯৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পাবিবারিকভাবে কোনো আয়োজন নেই।
জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাবেল বলেন, জেলা শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে মরমি কবি হাসন রাজার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সন্ধ্যা ৬টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করা হবে। এছাড়া ২১ ডিসেম্বর তার জন্মবার্ষিকী। জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।
হাসন রাজা মিউজিয়ামে আছে তার পোশাক-পরিচ্ছদ, তার বংশ পরিচয়, নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী, গানের পাণ্ডুলিপি, সংগীতচর্চায় ব্যবহার করা ঢোলসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং নানা দুর্লভ উপকরণ।










