মণিপুরের বিখ্যাত সিনেমা নির্মাতা আরিবাম শ্যাম শর্মা। মণিপুরের মানুষের কাছে তিনি নমস্য। এ পরিচালক বেশকিছু অসাধারণ সিনেমা নির্মাণ করেছেন। তবে সংরক্ষণের অভাবে তার অনেক সিনেমাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ডিজটাল মাধ্যমের আগে নির্মিত বহু সিনেমারই এই দশা। শ্যাম শর্মার সবচেয়ে আলোচিত ও ক্ল্যাসিক ধারার সিনেমা ‘ইশানোউ’র ক্ষেত্রেও ঘটেছিল একই ঘটনা। সিনেমাটির রিল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এ সিনেমা পুনরুদ্ধার করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়।
ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের নীতি হলো হারিয়ে যাওয়া ভারতীয় সিনেমাকে খুঁজে বের করে তা সংরক্ষণ করা। এক্ষেত্রে গুণী নির্মাতা ও ক্ল্যাসিক ঘরানার সিনেমাকে গুরুত্ব দেয়া হয়। সে কারণেই আরিবাম শ্যাম শর্মার সিনেমাটিকে বেছে নেয়া হয়েছিল। এর পরই সিনেমাটি সংরক্ষণ করার কার্যক্রম শুরু করা হয়।
এ ধরনের ক্ষেত্রে সিনেমা সংরক্ষণ করা একটি দুরূহ কাজ। আরিবাম শ্যাম শর্মার সিনেমাটি পুনরুদ্ধার করতে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছরেরও বেশি। এক্ষেত্রে সিনেমার ১৬ মিলিমিটারের মূল নেগেটিভ ব্যবহার করা হয়েছে উৎস হিসেবে। ফিল্মের নেগেটিভ নেয়া হয় ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়া থেকে। নেগেটিভ নিয়ে দেখা যায় তা অনেক জায়গায় নষ্ট হয়ে গেছে। ফিল্ম হেরিটেজের মতে, সিনেমার বেশকিছু রিলে ‘ভিনেগার সিনড্রোম ডিকে’ ছিল। মূলত উষ্ণ ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখা হলে ফিল্মে এ সমস্যা হয়। এতে ফিল্মের কিছু জায়গা গলে বেঁকে যায় এবং সেখান থেকে ভিনেগারের গন্ধ আসে। এ কারণেই এমন নাম। এছাড়া সিনেমার রিলের অনেক জায়গা বেঁকে ও ফেটে গেছে। বহু জায়গায় দাগ। এ বিষয়গুলো ঠিক করা ছিল ফিল্ম হেরিটেজ টিমের প্রথম কাজ।
ঠিক করতে গিয়ে দেখা যায়, রিলের বিভিন্ন অংশের ছবির মান বিভিন্ন ধরনের। এর বাইরে আরো একটা সমস্যায় পড়তে হয়। ইশানোউর আলাদা কোনো সাউন্ড নেগেটিভ ছিল না। আরিবাম শ্যাম শর্মার কাছে ৩৫ মিলিমিটারের দুটো প্রিন্ট ছিল। সেখান থেকে শব্দ গ্রহণ করেছিল ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন। এছাড়া সিনেমাটি ১৬ মিলিমিটারে শুট করা ও কম বাজেটের কারণে এর লাইটিংয়েও ছিল সমস্যা। এরও সমাধান করেছিল সংরক্ষণ টিম। চেন্নাইয়ের প্রসাদ করপোরেশন প্রাইভেট লিমিটেডে রিলের ডিজিটাল ক্লিনআপ করা হয়। দৃশ্য উদ্ধারের পাশাপাশি কালার কারেকশন করা হয় লা ইমাজিন রিট্রোভাটা, বোলোগনায়। সেখানে ওয়েট গেট স্ক্যানারের মাধ্যমে সিনেমা পুনরুদ্ধার করা হয়। এরপর কালার কারেকশনের মাধ্যমে লাইটিং ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান করে সিনেমা পুনরুদ্ধার করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শ্যাম শর্মার কাছ থেকে নেয়া প্রিন্ট থেকে পাওয়া শব্দ।
ইশানোউ মূলত মণিপুরি সংস্কৃতির একটি সিনেমাটিক উপস্থাপনা। মণিপুরিদের প্রাত্যহিক জীবনকে দেখায় এ সিনেমা। এর সঙ্গে সংগীত যুক্ত হয়ে এটিকে করে তুলেছে ক্ল্যাসিক। সিনেমার সংগীতও পরিচালনা করেছেন আরিবাম শ্যাম শর্মা। তিনি এ সিনেমায় ‘মাইবি’দের দৈনন্দিন জীবন, তাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও আচার দেখানোর পাশাপাশি এনেছেন মণিপুরি বাদ্যযন্ত্র। সিনেমায় তিনি ব্যবহার করেছেন পেনা নামে মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র, যা তার দিয়ে তৈরি। এছাড়া ব্যবহৃত হয়েছে বাঁশের বাঁশি ও স্থানীয় যৌথ সংগীত। সিনেমাটিতে শ্যাম শর্মার ক্যামেরার কাজ, গল্প বলার ধরন একে ক্ল্যাসিকে পরিণত করেছে। পাশাপাশি মণিপুরি জীবনের উপস্থাপনা একে সিনেমার পাশাপাশি ডকুমেন্টারির মর্যাদাও দেয়।
আরিবাম শ্যাম শর্মার সিনেমাটি মণিপুরের মানুষের জীবন ও ভারতের সিনেমা উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন তা মনে রেখেই সিনেমাটি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ করেছে। পাশাপাশি সিনেমাটি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৯০ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্ল্যাসিক সেকশনে প্রদর্শিত হয়েছে বুনুয়েল থিয়েটারে।
ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও স্ক্রল ডট ইন অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান










