ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে বলা হয় ভাষা আন্দোলনের অগ্রপথিক। তিনি ছিলেন একাধারে আইনজীবী, সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ। তার জীবন ছিল বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে বাংলা ভাষা নিয়ে সর্বপ্রথম সরব হয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পাকিস্তান গণপরিষদে অধিবেশনের কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ভাষায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উত্থাপন করেন। দেশবরেণ্য এ কীর্তিমানকে নিয়ে এবার নির্মিত হলো প্রামাণ্য চলচ্চিত্র ‘অবিনশ্বর’। সরকারি অনুদানে নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী নির্মাতা ফাখরুল আরেফীন খান। এর আগে ভুবনমাঝি ও গণ্ডি নামের দুটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি কুষ্টিয়া, কুমারখালী ও ঢাকার কয়েকটি স্থানে দৃশ্যধারণ হয়েছে ‘অবিনশ্বর’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটির। বর্তমানে পোস্ট-প্রডাকশনের কাজ চলছে। প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন নওফেল জিসান, আতিক রহমান, যশ জায়েদী, আমিরুল ইসলাম, শাহীন সরকার, আসলাম আলী, আনোয়ার বাবু, হালিম স্বপন প্রমুখ। এছাড়া এতে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নিয়ে কথা বলেছেন মেজর জেনারেল [অব.] ইমামুজ্জামান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল [অব.] সাজ্জাদ জহির, বীর প্রতীক ও ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের দৌহিত্র অ্যারোমা দত্ত এমপি।
পরিচালক ফাখরুল আরেফীন খান বলেন, ‘বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধে যে ক’জন মানুষকে নিয়ে আমরা আলোচনার মধ্যে থাকি, সেখানে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত অনুপস্থিত। তাকে আমরা কখনো আলোচনার মধ্যে আনি না। অথচ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার ভাষা আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। সে কারণেই শেষ পর্যন্ত তাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল ১৯৭১ সালে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত নিজে যা করেছিলেন, তার চেয়েও তার বড় কীর্তি আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দেয়ায়। সে আগুন সবখানে ছড়িয়ে গিয়েছিল। তিনি সবসময় মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতেন। জীবনে ও মরণে এই নির্লোভ, সদাচারী, দেশপ্রেমিক, সত্যসন্ধ মানুষ অকম্পিতচিত্তে নিজের কর্তব্য করে গেলেও রয়ে গেছেন প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতোই আড়ালে। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিতব্য প্রামাণ্যচিত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলা ভাষার এ মহান সৈনিককে তরুণ প্রজন্মের কাছে বাংলা ভাষার আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও চেতনাকে পৌঁছে দেয়া।’
গড়াই ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি আগামী ২ নভেম্বর শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৩৬তম জন্মবার্ষিকীতে মুক্তি পাবে বলে জানিয়েছেন নির্মাতা।
১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী ও ব্যারিস্টার আবদুর রসুলের রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯০৭ সালে ত্রিপুরা হিতসাধনী সভার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৪৬ সালে কংগ্রেস দলের পক্ষে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। একই বছরে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য পূর্ববঙ্গ থেকে তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে সব কার্যবিবরণী ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও অন্তর্ভুক্ত রাখার দাবি উত্থাপন করেন এ সাহসী বাঙালি। ১৯৫৬-৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ-বিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা পুত্র দিলীপকুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গ্রেফতার করে এবং তাদের কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।










