বাংলাদেশের মানুষকে সহায়তার জন্য ১৯৭১ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানাজন নানাভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, যার অনেক ঘটনাই রয়েছে আমাদের অজানা। ঠিক তেমনি ফরাসি এক যুবক জ্যঁ কুয়ের বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ফ্রান্সের প্যারিসের অরলি বিমানবন্দরে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি বিমান ছিনতাই করেন জ্যঁ কুয়ে। তার দাবি ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ওই বিমানে তুলে দিতে হবে। তাহলেই কেবল মুক্তি পাবে বিমানের সব যাত্রী।

এ ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত প্রথম আন্তর্জাতিক সিনেমা ‘জেকে ১৯৭১’। ছবিটি নির্মাণ করেছেন ‘ভুবন মাঝি’ ও ‘গণ্ডি’র নির্মাতা ফাখরুল আরেফীন খান। সম্প্রতি সিনেমাটির দৃশ্যধারণ, সম্পাদনা, ডাবিং, কালার কারেকশন, ভিএফএক্সের কাজ শেষ হয়েছে। পরিচালক বলেন, ‘আমরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আফগান যুদ্ধ, এমনকি সোমালিয়ার যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত সিনেমা দেখি। কিন্তু আন্তর্জাতিক দর্শকদের দেখানোর জন্য ইংরেজিতে আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো সিনেমা নেই। তাই আমরা সিনেমাটি বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। এরই মধ্যে আমরা ছবির সব কাজ শেষ করেছি। আশা করছি শিগগিরই ছবিটি মুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারব।’ গড়াই ফিল্মসের ব্যানারে নির্মিত ‘জেকে ১৯৭১’ ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পশ্চিমবঙ্গের সৌরভ শুভ্র দাশ। এছাড়া বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতা ফ্রান্সিকো রেমন্ড, রাশিয়ান অভিনেত্রী ডেরিয়া গভ্রুসেনকো, অভিনেতা নিকোলাই নভোমিনাস্কি, পশ্চিমবঙ্গের সব্যসাচী চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীলসহ আরো প্রায় ৩৬ জন অভিনয়শিল্পী।

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) ‘সিটি অব কুমিল্লা’ নামের একটি বোয়িং-৭২০বি বিমান প্যারিস অরলি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ১৭ জন যাত্রী ও ছয়জন ক্রু নিয়ে বিমানটি লন্ডন থেকে প্যারিস, রোম ও কায়রো হয়ে করাচি যাবে। এর মধ্যে পাঁচজন যাত্রী প্যারিস থেকে উঠবে। ওই পাঁচজনের সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে বোয়িংটিতে উঠে বসেন ২৮ বছর বয়সী যুবক জ্যঁ কুয়ের। পাইলট আকাশে ওড়ার প্রস্তুতি হিসেবে বিমানটি চালু করতেই পকেট থেকে পিস্তল বের করে জ্যঁ ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কেউ তার নির্দেশ অমান্য করলে সঙ্গে থাকা বোমা দিয়ে পুরো বিমানবন্দর উড়িয়ে দেয়ার হুমকি দেন তিনি। ওয়্যারলেসটি কেড়ে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মাধ্যমে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে জ্যঁ নির্দেশ দেন, বিমানটিতে ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী তুলে তা যুদ্ধাহত ও বাংলাদেশী শরণার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা ধরে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও তার সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নাড়াতে পারেনি।

বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা মুহূর্তে পুরো ফ্রান্স হয়ে ইউরোপসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সসহ বিশ্বের প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেলগুলো কিছুক্ষণ পরপর ঘটনার হালনাগাদ সংবাদ দিতে থাকে। বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধবিরোধী ও মানবতার পক্ষের আন্দোলনকারীদের কাছে জ্যঁ নামের ওই বাবরি দোলানো যুবক রীতিমতো হিরো বনে যান। তার সঙ্গে দেখা করতে দেশটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা অরলি বিমানবন্দরে এসে জড়ো হতে থাকেন। তাদের কেউ কেউ গ্রেফতারও হলেন। একপর্যায়ে সেদিন রাত ৮টায় জ্যঁ পুলিশের হাতে আটক হন।

আলজেরীয় সৈনিক বাবার একমাত্র সন্তান জ্যঁ কুয়ে। ফরাসি সেনাবাহিনীর হয়ে বিদ্যুৎ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে ইয়েমেনে চাকরি করেছেন। যুদ্ধে আহত শিশু ও শরণার্থীদের কষ্টের স্মৃতি তাকে এ দুঃসাহসী কাজে উৎসাহী করে তোলে। পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ মানুষের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে জ্যঁ পুরো ঘটনায় নজর রাখছিলেন। ফরাসি পত্রিকায় বাঙালিদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা তাকে ব্যাপকভাবে পীড়িত করে। বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কিছু একটা করার উপায় খুঁজতে গিয়েই বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা আঁটেন তিনি। এ বিষয়ে তিনি অনুপ্রেরণা পান আন্দ্রে মারলোর বাংলাদেশ নিয়ে লেখা ও বক্তৃতা থেকে।