নির্মাতা জুটি ‘‌রাজ অ্যান্ড ডিকে’র সাম্প্রতিক ওয়েব সিরিজ ‘‌গানস অ্যান্ড গুলাবস’। নেটফ্লিক্সের সিরিজটি স্পষ্টতই আশি-নব্বইয়ের দশকের সিনেমা জগতের প্রতি এক শ্রদ্ধার্ঘ্য। অপরাধের অন্ধকার জগৎ উপস্থাপনার সঙ্গে তুখোড় হাস্যরস, ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিবিধুরতার সঙ্গে গ্যাং ওয়ার—এমন বৈপরীত্যই কাছাকাছি এনেছে বন্দুক আর গোলাপকে। হাত কেটে প্রেমিকার নাম লেখা, দেয়ালে চিকা মেরে এলাকায় বদনাম রটানো থেকে ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজতে থাকা ব্রায়ান অ্যাডামসের গান, সে গান শুনতে গিয়ে বারবার ক্যাসেটের ফিতা জড়িয়ে যাওয়া, ইয়েজদী বাইক, ক্যাম্পা কোলা, রিকশা আর্টের মতো পোস্টার সবকিছুই ফিরিয়ে নিয়ে যায় কুমার শানুর দরাজ গলার নব্বইয়ের দশকে। 

মূল গল্পটা আফিম চাষের কেন্দ্র গুলাবগঞ্জের। আফিম ব্যবসাকে হাতের মুঠোয় আনতে দুই সন্ত্রাসী দলের দ্বৈরথ, পুলিশের হস্তক্ষেপ, আফিমচাষীর মতো সাধারণ মানুষের জীবনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে গুলাবগঞ্জের আখ্যান। 

রাজ অ্যান্ড ডিকের জগতে অপরাধ হলো ট্র্যাজিক-কমেডির নামান্তর। ট্র্যাজেডি এ অর্থে, এখানে পরিস্থিতির শিকার মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার্থে শুরু হয় অপরাধ আর সে অপরাধই পরিণতি নিয়ে আসে জীবনে। আর কমেডিটা হয় ঠিক তখন, যখন বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন সাধারণ মানুষেরা পলক না ফেলেই সাবলীলভাবে অপরাধের রাজত্ব চালায়। পলক না ফেলে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই গুবলেট পাকিয়ে ফেলে। গম্ভীর সংকটময় পরিস্থিতিতে তাদের মুখ ফসকে বেরিয়ে যায় হাস্যকর কথা। এ যেন আমাদের চারপাশের সব আনাড়ি, চিরচেনা সাধারণ মানুষের আখ্যান।

আফিমের দ্বন্দ্বের এ গল্পে প্রত্যেকটা চরিত্র—তারা যতই ভয়ানক, হিংস্র ও নীতিবান কিংবা সহজ সরল হোক না কেন, স্বাভাবিকভাবে এমন ঘটনার সামনে পড়ে এমন সব পরিস্থিতি তৈরি করে যেটা আপাতভাবে হাস্যরসের উদ্রেক করে। এ হাস্যরসময় ঘটনার পরই হয়তো এমন সাংঘাতিক কিছু ঘটবে, যা কল্পনাও করা ভার। সীতা মেননের লেখা গল্পে প্রতিটি চরিত্রই বেশ যত্ন নিয়ে চরিত্রায়ণ করা হয়েছে। ছোট চরিত্রগুলোকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পর্দায় একের পর এক অচেনা অজানা চরিত্র উদয় হচ্ছে হারিয়ে যাচ্ছে, এমন তাড়াহুড়ো চোখে পড়বে না। সবক’টা প্রধান চরিত্রই গল্পের গতির সঙ্গে তাদের গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছায়। কাউকেই নির্দিষ্ট কোনো ঘেরাটোপে আটকে রাখা যায় না।

মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পরনে জ্যাকেট, হাতে ক্যাম্পা—রাজকুমার রাও অভিনীত ঘষামাজা গ্যাংস্টার টিপু টাইগার নামের চরিত্রটির সারল্য দর্শকের নাড়িতে আঘাত দিতে প্রস্তুত। লুডো, মণিকা মাই ডার্লিংয়ের মতো ব্ল্যাক কমেডি সিনেমায় খানিকটা এ অবতারে দেখা গিয়েছিল রাজকুমারকে। টিপু টাইগারের গল্পটা নিজস্ব সত্তাকে আবিষ্কারের, নিজের মুখোমুখি হওয়ার একটা মনোজাগতিক সফর। মুগ্ধ করেছেন গুলাবগঞ্জের আফিম ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সদ্য বদলি হয়ে আসা নারকোটিক অফিসার দুলকার সালমানও। গম্ভীর, রাশভারী অর্জুন চরিত্রে বেশ মানানসই তিনি। ফ্যামিলি ম্যানের শ্রীকান্ত তিওয়ারি বা ফারজির মাইকেলের মতো সংকটময় পারিবারিক জীবন কিন্তু গানস অ্যান্ড গুলাবসের অর্জুনের নয়। এ প্রধান দুই চরিত্রের বাইরে নজর কাড়বে গুলশান দেভাইয়া অভিনীত ভাড়াটে খুনি ‘‌চার-কাট আত্মারাম’ চরিত্রটি। দাহাড়ের শান্তশিষ্ট ভদ্র পুলিশ অফিসারের সঙ্গে এ সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের ভয়ানক খুনিকে যেন মেলানোই যায় না। নব্বইয়ের দশকের সঞ্জয় দত্তের আদলে রাখা কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল, হাতে ফোল্ডিং নাইফ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এ চরিত্র মূর্তিমান আতঙ্ক, স্বয়ং যমদূত। কই মাছের প্রাণ তার, শুধু পিছলে যায়। সিরিজের প্রথম পর্ব থেকে একদম শেষ দৃশ্য পর্যন্ত ছোট গাঁচি চরিত্রে নিজেকে প্রমাণ করেছেন আদর্শ গৌরব। আফিম চালানকারী গাঁচি আর নাবিদ দ্বৈরথের মাঝে আটকা পড়া সদ্য যুবক এ চরিত্র যেকোনো মূল্যে বাবাকে খুশি করতে চায়, কিন্তু ব্যর্থ হতে থাকে পদে পদে। এ সিরিজের অন্যতম বড় চমক বাঙালি অভিনেতা রজতাভ দত্ত আর প্রয়াত সতীশ কৌশিক।

গড়পড়তা ৫০ মিনিট থেকে দীর্ঘ ১২০ মিনিটের সাতটি পর্বে বিভক্ত সিরিজটির মূল কাহিনী আন্দাজ করাটা খুব কঠিন না হলেও বহুবর্ণিল চরিত্রগুলোর নিজেকে আবিষ্কারের দীর্ঘ যাত্রাটা দর্শকের মনোযোগকে ধরে রাখতে সক্ষম। নস্টালজিয়া, অ্যাকশন, প্ৰেম, বিশ্বাসঘাতকতা, গ্যাংওয়ার, মাফিয়া, আফিম, পুলিশ, স্কুলের প্রেম, মফঃস্বল আর অবশ্যই বন্দুক ও গোলাপের বৈপরীত্য সিরিজটাকে একটানা শেষ করতে বাধ্য করে। সিরিজটারও একটা কেউকেটা হয়ে ওঠার চেষ্টা আছে। এ ‘‌চেষ্টা’ দর্শকদের সামনে চলে এসেছে বলেই তার আবেদনটা যেন হারিয়ে গেল। বয়ানের কৌশলে, ভঙ্গিমায় বেশি মনযোগ দিতে গিয়ে চিত্রনাট্যের বুনোটে ফাঁক থেকে গেল অনেকটা। কাহিনীর মোড়, চূড়ান্ত পরিণতি কোনোটিই বিস্ময়কর নয়। ব্যাপ্তি তাই খানিকটা হলেও কমানো যেত।

পঙ্কজ কুমারের চোখ ধাঁধানো সিনেমাটোগ্রাফি সিরিজটিকে নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়। আগাগোড়া কল্পিত মফস্বল গুলাবগঞ্জকে বাস্তবিক করে তুলতে দৃশ্যধারণ করা হয়েছে উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুন আর তার আশপাশে। অভিনেতাদের স্টাইল, চুলের কাট, চলন-বলনের ধরন আশির দশকের সিনেমার কথা মনে করিয়ে দেবে। আবহসংগীত দৃশ্যগুলোর মর্যাদা অটুট রাখে। সম্ভবত ধাওয়া করার দৃশ্যে স্নায়ুচাপের সঙ্গে কমেডি রাখার প্রতি রাজ অ্যান্ড ডিকের বিশেষ দুর্বলতা আছে। দ্য ফ্যামিলি ম্যানের স্কুটিতে চড়ে ধাওয়া করার দৃশ্য, ফারজির অ্যাম্বাসেডরের পেছন দিয়ে টাকা ওড়ানোর দৃশ্যের মতো এখানেও মোটর সাইকেল চেজের খুব মজাদার কিছু মুহূর্ত দর্শকরা পাবেন। সব মিলিয়ে মানবচরিত্রের দ্বৈততা, রোমাঞ্চের সঙ্গে হাস্যরসের উপস্থিতি থাকার পরও রাজ আর ডিকের পূর্ববর্তী দুটো কাজের থেকে ‘‌গানস অ্যান্ড গুলাবস’ ভিন্নতর।