চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময় থেকে ক্রমেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমন ঘটেছে। দেশব্যাপী মব সন্ত্রাস, ছিনতাই, প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এগুলো নিয়ন্ত্রণে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে গণ-অভ্যুত্থান ও সরকার গঠনের প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও দেশবাসীকে একের পর এক সহিংস ঘটনা দেখতে হচ্ছে, সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে। এর সাম্প্রতিক নজির হলো ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘোষণা আসার পর দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যমের কার্যালয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। এতে সাংবাদিকদের অনেকেই ভবনে আটকে পড়েন এবং আগুনের অতিরিক্ত ধোঁয়ায় তাদের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এমনকি তাদের কার্যালয়ে লুটপাটও চালিয়েছে হামলাকারীরা। একই সময়ে দেশের একজন বর্ষীয়ান সম্পাদককে হেনস্থার ঘটনাও ঘটেছে। কাছাকাছি সময়ে রাজধানীর ছায়ানট ভবনেও ভাংচুর করা হয়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহের ভালুকায় একজনকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মবের মাধ্যমে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি এরপর মরদেহ ঝুলিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। এর আগে ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার তিনি মারা গেছেন। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরেকটি নজির এটা।
এ বছরের আগস্টে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এক বিবৃতি দেয়। এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সরকারের এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে সাংবাদিকসহ সব নাগরিকের শারীরিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সরকার সম্পূর্ণরূপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুঃখজনকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার পরও সরকার গঠনের পর থেকে শুরু করে চলতি বছরজুড়েই বহু সহিংসতা ঘটতে দেখা গেছে। একাধিক পরিসংখ্যানের দিকে লক্ষ করলে সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর গত অক্টোবরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিগত সরকারের শাসনামল অবসানের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ২৮১ জন নিহত হয়েছেন। আর অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণের পর ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন বিচারবহির্ভূতভাবে এবং আরো ১৫৩ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। যদিও প্রায় কোনো না কোনো সংবাদ সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে দেশে কারো কোনো নিরাপত্তার ঝুঁকি নেই। সরকার ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রস্তুত। বাস্তবতা হলো, জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রস্তুতি সরকার গঠনের শুরু থেকে আজও প্রশ্নবিদ্ধ। এ পরিস্থিতি চলমান থাকলে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতা আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে মব সন্ত্রাসের ঘটনা বাড়ার আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
গণমাধ্যমকে বলা হয় একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ হলো স্বাধীন মতপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া। নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার ক্ষুণ্ণ ও এবং গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হওয়া। বিবেচনায় আনা প্রয়োজন, গণমাধ্যমের ওপর হামলায় জড়িতরা জুলাই অভ্যুত্থানের ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে চেতনা ছিল তা বাস্তবায়নের পথে বড় হুমকি। অথচ গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সুগম করা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতির বড় অংশ ছিল। কেবল গণমাধ্যম না, মতের অমিল হলে প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি কেউ বাদ যাচ্ছে না হামলার হাত থেকে। এ চিত্র সরকার গঠনের শুরুর দিকেও দেখা গেছে।
দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীর মাঠে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু সেটা দেখা যাচ্ছে না। সরকার এ বাহিনীকে পুরোপুরি সক্রিয় করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলের কাছে থেকেও তাদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করার অভিযোগ রয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্তসংখ্যক সংশ্লিষ্ট সদস্য না থাকা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব শুধু ঘটনার পর উপস্থিত হওয়া নয়। আগাম ঝুঁকি শনাক্ত করা, সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত থাকাও তাদের কাজের অংশ। জানা গেছে, গণমাধ্যমের ওপর হামলাকারীরা শাহবাগ থেকে মিছিল নিয়ে গণমাধ্যমের কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। তাদের প্রতিরোধ করা যায়নি। পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ বা আর্মি মোতায়েন করা হয়নি। প্রায় প্রত্যেক ঘটনার পর তাদের বিশাল বহর দেখা যায়। এরপর মামলা দায়ের ও তদন্তের আশ্বাস দেয়া হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনার নজির মেলে না।
সরকারকে অবশ্যই গণমাধ্যমসহ সব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দিতে হবে। এজন্য কঠোরভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিতও জরুরি। মবের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স দরকার। নইলে মব ভায়োলেন্স কমবে না। এক্ষেত্রে জরুরি হলো পুলিশের সাহস ও মনোবল বাড়ানো। সেটা কীভাবে সম্ভব তা সরকারকে ভাবতে হবে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী ঘটনাবলির কারণে তাদের মনোবল যে দুর্বল হয়ে পড়েছে তা উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে পুলিশসহ সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা আবশ্যক। নয়তো দেশের দীর্ঘদিনের অগণতান্ত্রিক পরিবেশ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, প্রশাসনে অস্থিতিশীলতা ও ভীতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করা এবং সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার বা গুজব ইত্যাদির প্রভাবে সহিংসতা বাড়বে বৈ কমবে না।
নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এক্ষেত্রে তারা সেভাবে সফলতা দেখাতে পারেনি। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আসছে। সরকারের মনোযোগী হওয়া উচিত যেন অন্তত এ সময়ে আর কোনো সহিংসতার ঘটনা না ঘটে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা। সব রাজনৈতিক দলের মাথায় রাখা প্রয়োজন, শিগগিরই যদি চলমান অরাজকতা থেকে উত্তরণ না ঘটে, ভবিষ্যতে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, তার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হবে এটি।










