একদিকে দেশের ভেতরে আমাদের শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের মর্যাদা ধরে রেখেছে; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি, যা কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ের মতো বৈশ্বিক সূচকগুলোয় স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ বৈপরীত্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অথচ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি যখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষা কাঠামো অনেকটাই স্থবির রয়ে গেছে। কেন এ স্থবিরতা এবং কীভাবে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাই এখন জরুরি। আসলে এটি একটি বহুমাত্রিক সংকট, যার মূলে রয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও বর্তমান যুগের চাহিদার মধ্যে গভীর এক দার্শনিক দূরত্ব।

উন্নত প্রযুক্তির যুগে প্রথম শিল্প বিপ্লবের উত্তরাধিকার: প্রকৌশল শিক্ষার সূচনা প্রথম শিল্প বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে। ১৭৬০-৫০ সালের মধ্যে বাষ্পশক্তি, যান্ত্রিক কারখানা ও বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের বিস্তার নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা তৈরি করে। ফলে প্রকৌশল গড়ে ওঠে এমন এক শাস্ত্র হিসেবে, যেখানে নির্ভুলতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও নিরাপত্তা ছিল প্রধান ভিত্তি। মানবিক শ্রম এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরতার বদলে গুরুত্ব পেতে শুরু করে মানসম্মত পদ্ধতি ও সুসংগঠিত প্রক্রিয়া।

কিন্তু আজকের বিশ্ব যেখানে একুশ শতকের পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষা এখনো অনেকটাই উনিশ শতকের কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, গৎবাঁধা পরীক্ষা ও কঠোর পাঠ্যবিষয়ক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এ ব্যবস্থা এমন এক সময়ের জন্য তৈরি, যখন কর্মজীবন ছিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং জ্ঞান ছিল প্রায় অপরিবর্তিত। ফলে আমরা অজান্তেই শিক্ষার্থীদের এক ধরনের ‘‌হিউম্যান ক্যালকুলেটর’ হিসেবে গড়ে তুলছি, যেখানে বাস্তবে সে জায়গা এখন দখল করে নিচ্ছে উন্নত অ্যালগরিদম ও প্রযুক্তি।

দক্ষতার মেয়াদ ক্রমেই কমছে: বর্তমান যুগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল টুইন ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের। প্রযুক্তির পরিবর্তন এখন শুধু দ্রুত নয়—এটি ধারাবাহিক, কখনো রীতিমতো বিপর্যয়কর। এ বাস্তবতায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার স্থায়িত্ব দ্রুত কমে যাচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বা প্রোগ্রামিং ভাষা অনেক সময় একজন শিক্ষার্থীর ডিগ্রি শেষ হওয়ার আগেই অচল হয়ে পড়তে পারে। ফলে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। আমরা চার বছরের শিক্ষায় যে দক্ষতা দিচ্ছি, তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ৪০ বছরের কর্মজীবন চালাতে হচ্ছে।

এ ব্যবধান দূর করতে শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। এখন ‘কী শিখব’—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘কীভাবে নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুন করে গড়ে তুলব’ তা শেখা। সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা নিরূপণ ও সমাধানের সক্ষমতা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, সহনশীলতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতা —এসব এখন আর অতিরিক্ত গুণ নয়; এগুলোই টিকে থাকার অপরিহার্য দক্ষতা।

মুখস্থবিদ্যা থেকে সৃজনশীল পদ্ধতিতে উত্তরণ: যে শিক্ষা ব্যবস্থা বোঝার চেয়ে মুখস্থবিদ্যার ওপর বেশি জোর দেয়, তা শুধু সেকেলে নয় কৌশলগত দিক থেকেও ক্ষতিকর। এখন এমন এক সময়, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই কোড লিখতে ও সার্কিট ডিজাইন করতে সক্ষম। তাই পাঠ্যক্রমে কোডের সিনট্যাক্স শেখানোর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত সিস্টেম আর্কিটেকচার বোঝা এবং সমস্যা বিশ্লেষণের দক্ষতায়। ভবিষ্যতের প্রকৌশলী কেবল কোড লেখেন না; তিনি বুদ্ধিমান সিস্টেম পরিচালনা করতে পারেন, সেগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করেন এবং বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে তা প্রয়োগ করতে সক্ষম হন।

এ পরিবর্তন আনতে হলে শিক্ষণ পদ্ধতিতেও বদল জরুরি। লেকচারভিত্তিক একমুখী শিক্ষার পরিবর্তে প্রজেক্ট-বেজড লার্নিংয়ের মতো পদ্ধতি চালু করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যার সমাধানে কাজ করবে—যেসব সমস্যার নির্দিষ্ট বা একক উত্তর নেই। শিক্ষায় অনিশ্চয়তাকে গ্রহণ করতে হবে; শুধু নিয়ম মেনে চলাকে পুরস্কৃত করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কাঠামোগত সংস্কার, ডিগ্রি মডেলের নতুন ভাবনা: প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে শুধু পাঠ্যবিষয় নয়, প্রোগ্রামের কাঠামোয়ও পরিবর্তন আনা জরুরি। একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে ‘‌সমন্বিত ৩+১ পদ্ধতি’। এ মডেলে প্রথম তিন বছরে শিক্ষার্থীরা মৌলিক জ্ঞান, নীতিশাস্ত্র ও ডেটা সায়েন্স বা সিস্টেম থিংকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখবে। শেষ বছরটি হবে পূর্ণকালীন শিল্প খাতে কাজ বা প্রকল্পভিত্তিক অভিজ্ঞতার জন্য, যেখানে তারা বাস্তব সমস্যার সমাধানে সরাসরি যুক্ত থাকবে।

এভাবে প্রচলিত ইন্টার্নশিপের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে এবং শিক্ষা ও শিল্প খাতের মধ্যে একটি কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক সংযোগ গড়ে উঠবে।

জ্ঞান বিনিময়ের দেয়াল ভাঙা: আধুনিক প্রকৌশল সমস্যাগুলো স্বভাবতই জটিল, বহুমাত্রিক ও আন্তঃবিষয়ক। আজকের অবকাঠামো ক্রমেই ‘‌স্মার্ট’ হয়ে উঠছে, যেখানে সেন্সর, ডেটা ও স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করে। একইভাবে উৎপাদন ব্যবস্থাও সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেমের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ বাস্তবতায় ভবিষ্যতের প্রকৌশলীদের হতে হবে এক ধরনের ‘‌হাইব্রিড চিন্তাবিদ’। অর্থাৎ একজন প্রকৌশলীকে শুধু নিজের মূল বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। যেমন একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে কেবল কাঠামোগত নকশা জানলেই হবে না; তাকে ডেটা অ্যানালিটিকস সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। এ সমন্বয় না থাকলে শিক্ষার্থীরা সংকীর্ণ দক্ষতার মধ্যে আটকে যাবে, যা বর্তমান বিশ্বের বহুমুখী ও দ্রুত পরিবর্তনশীল চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা কাটানো: কিউএস র‍্যাংকিং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন, যেখানে গবেষণার উদ্ধৃতি (সাইটেশনস) ও একাডেমিক সুনামের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এ সূচকগুলোয় বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে।

মালয়েশিয়া ও চীনের মতো আঞ্চলিকভাবে এগিয়ে থাকা দেশগুলোয় শিক্ষকরা সাধারণত ‘‌গবেষণা-প্রথম’ মনোভাব নিয়ে কাজ করেন। বিপরীতে বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষককে ‘‌পাঠদান-প্রথম’ ভূমিকায় থাকতে হয়, যেখানে সপ্তাহে প্রায় ১৫ বা তারও বেশি ক্রেডিট ঘণ্টা ক্লাস নিতে হয়। এমন চাপের মধ্যে নিয়মিত ও মানসম্মত গবেষণা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই গবেষণা হয়ে দাঁড়ায় পদোন্নতির শর্ত পূরণের একটি মাধ্যম—এক ধরনের ‘‌টিকে থাকার জন্য প্রকাশনা’; যেখানে বিশ্বমানের উদ্ভাবন বা বড় পরিবর্তনের লক্ষ্য প্রায় অনুপস্থিত।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে আস্থার ঘাটতি। সিঙ্গাপুর বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় এ দুই ক্ষেত্র প্রায় বিচ্ছিন্ন। শিল্প খাত এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ সম্পর্ককে ‘‌পারস্পরিক অবিশ্বাস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে শিল্প খাতের ধারণা—বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর উদ্ভাবন তৈরি করতে সক্ষম নয়।

আমাদের করণীয়: বাস্তবতা হলো শিল্প খাত ধীরে ধীরে স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে এগোচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষি থেকে শুরু করে অর্থায়ন ও সেবা সব খাতেই বদলে দিচ্ছে। ফলে প্রকৌশল শিক্ষার প্রেক্ষাপটও অনিবার্যভাবে বদলাবে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে সরকার ও শিল্প খাত উভয়কেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ে–শিল্প সহযোগিতা জোরদার করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরনো কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়া এখন সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও নিজেদের লক্ষ্য নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। তারা আর শুধু স্থির জ্ঞানভিত্তিক স্নাতক তৈরির কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং এমন প্রকৌশলী গড়ে তুলতে হবে, যারা পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে, সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করতে পারে এবং উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম, বুদ্ধিমান প্রযুক্তির সঙ্গে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।

এ রূপান্তর সহজ হবে না। তবে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে স্থবির থাকার মূল্য দীর্ঘমেয়াদে দেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়