বিশেষত ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় নগরের সঙ্গে গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বেনবেইজ) তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৬৯৪ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫৩টি রয়েছে গ্রামাঞ্চলে (৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ)। এদিকে মাধ্যমিক স্তরের ৬৮ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের। উচ্চ ব্যয় ও গ্রামীণ সুযোগ-সুবিধার অভাব থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এ স্তর থেকে ঝরে পড়ে। ফলে মাধ্যমিক স্তরকে ঘিরে কাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা নষ্ট হওয়ার সংকট বাড়ছেই। এ সমস্যা সমাধানে সরকারকে দেশের সব প্রান্তে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টিকে জোর দিতে হবে।

মাধ্যমিক শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এ স্তরেই শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ বা শ্রমবাজারে প্রবেশের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু মানবাধিকার পরিমাপ উদ্যোগের (এইচআরএমআই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার আয়স্তর অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষায় যতটা অর্জন করার কথা তার মাত্র ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ পূরণ করতে পারছে। দেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় কাঠামোগত দুর্বলতা হলো এর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি এবং শহরকেন্দ্রিক। দেশে ১৬ হাজারেরও বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশই বেসরকারি। এসব প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্র মূলত এমপিওভুক্তির মাধ্যমে শিক্ষকদের আংশিক বেতন দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে অভিভাবকদের বহন করতে হয় শিক্ষার সিংহভাগ ব্যয়। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পরিবারগুলো মোট শিক্ষা ব্যয়ের ৭১ শতাংশ নিজেরাই বহন করে। ফলে আর্থিকভাবে সক্ষম নয় এমন পরিবারগুলো অনেক সময় সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারে না। বিশেষত দুর্বল গ্রামীণ অর্থ ব্যবস্থায় শিক্ষা ব্যয় বহন অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্যই শিক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ ও সুযোগ-সুবিধা প্রসারের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুযায়ী পরিকল্পনা নিতে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে রাজধানীকেন্দ্রিক শিক্ষা অবকাঠামো নির্মিত হলেও প্রান্তিক অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে মনোযোগ দেয়া যায়নি। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানোর ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক সমতা এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

এদিকে শিক্ষা অবকাঠামো থাকলেও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে পিছিয়ে আছে প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশেষত মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে আসা সমস্যাগুলোর মধ্যে নিম্ন শিক্ষণফল, বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার ঘাটতি, বিদ্যালয়ভেদে মানের তীব্র বৈষম্য, দুর্বল পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি এবং ব্যাপক প্রাইভেট কোচিং উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হাতে-কলমে শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার মতো পাঠ্যসূচি এমনকি শারীরিক বিকাশের উপযোগী শারীরিক শিক্ষার বিষয়েও পাঠ্যসূচিতে পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকলেও সেগুলো শুধু পদোন্নতি বা পদায়নের বলেই বিবেচিত হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় আনার জন্য উদ্যোগ নেয়া হলেও ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবে শহরেই এগুলোর সুফল মেলে না। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে এসব উদ্যোগের সুফল পাওয়ার প্রত্যাশা কঠিন। সার্বিকভাবে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর রয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে দক্ষতাভিত্তিক ও সমস্যা সমাধানমুখী শিক্ষার দিকে যাওয়া তাই সময়ের দাবি।

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও জনসংখ্যার নিরিখে দেশের শিক্ষা কাঠামোকে ঢালাওভাবে সাজানো অসম্ভব—এমন মন্তব্য রয়েছে। তবে এ ধরনের বাস্তবতায়ও শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক উদাহরণ সামনেই রয়েছে। যেমন ভিয়েতনাম ১৯৮৬ সালে দোই-মোই সংস্কারের পর শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রে রাখে। এ ভাবনার অধীনে শুধু শহরাঞ্চল নয়, বরং পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। বিদ্যালয় অবকাঠামো স্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষকদের নানা সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত করে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এজন্য সরকার বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। ২০১৮ সালে দেশটি নিম্নমাধ্যমিক স্তরের সরকারি বিদ্যালয়গুলোর টিউশন ফি মওকুফ করে দেয়। বর্তমানে দেশটিতে সাক্ষরতার হার ৯৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতা পরিমাপক পিসা পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভিয়েতনামের শিক্ষার্থীরা ইউরোপের অনেক দেশ থেকেও এগিয়ে আছে। এশিয়ার অন্য দেশ দক্ষিণ কোরিয়াও বাংলাদেশের মতোই অর্থনৈতিকভাবে নাজুক ছিল। তবে দেশটি শিক্ষায় বৈষম্য দূর করার বিষয়টি উপলব্ধি করেছে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মান-সমান রাখতে ঘূর্ণায়মান পোস্টিং নীতি চালু করা হয়। এতে মেধাবী শিক্ষকরা বাধ্যতামূলকভাবে কিছু সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে পড়ান। ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য কেরালাও সর্বজনীন সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকে ভারতের সর্বোচ্চ সাক্ষর রাজ্য। অর্থাৎ নীতিনির্ধারণী সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন সম্ভব।

শিক্ষাকে মানোন্নত করতে নতুন সরকার কিছু ইতিবাচক রূপরেখা দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১২ দফা সংস্কার কর্মসূচিতে মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি শিক্ষা ও ক্রীড়া বাধ্যতামূলক করা, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, আইটেম ব্যাংক ও স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমপিও সুবিধা শ্রেণীকক্ষে সরাসরি পাঠদান প্রমাণের সঙ্গে যুক্ত করা এবং প্রতিটি উপজেলায় রোবোটিকস ও বিজ্ঞান কর্নার স্থাপনের মতো পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতিও উৎসাহজনক। তবে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান এখনো প্রকট। এ বাস্তবতায় ৫ শতাংশের প্রতিশ্রুতি বছর বছর কাগজে লেখা থেকে বাস্তবে নামানো দরকার। একটি তৃতীয় ভাষা শিক্ষার মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার আগে মৌলিক প্রশ্ন হলো, গ্রামের বিদ্যালয়গুলোয় আদৌ দক্ষ শিক্ষক আছে কিনা। বিশেষত যেখানে মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলা ও ইংরেজির মতো ভাষাদক্ষতা অর্জনেই শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছেন, সে সমস্যার সমাধান না করে তৃতীয় ভাষা দক্ষতার উদ্যোগটি নানাভাবে ব্যাহত হতে পারে।

মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধাগত ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করতে হলে বাজেটে একটি কৌশলগত পরিবর্তন দরকার। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকা উচিত। এজন্য একটি সুনির্দিষ্ট পাঁচ বছরমেয়াদি পথনকশা তৈরি এবং তার জন্য বার্ষিক বাজেটে আলাদা তহবিল বরাদ্দ রাখতে হবে। এছাড়া এমপিওভুক্তি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। যে অঞ্চলে শিক্ষার্থীর অনুপাতে প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে কম, সেখানে অগ্রাধিকারভিত্তিক বরাদ্দের নিয়ম করা প্রয়োজন। শিক্ষক সংকট সমাধানে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোস্টিং নেয়া শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা ও প্রণোদনার বিধান বাজেটে রাখতে হবে। গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারিত করতে হবে এবং তার বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যাতে আর্থিক সংকট কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পথ না আটকায়। শিক্ষা জাতীয়করণের প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। জাতীয়করণ মানেই মানোন্নয়ন নয়, শিক্ষকদের যোগ্যতা নিশ্চিত না করে জাতীয়করণ করলে অদক্ষতা কেবল সরকারি ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে। তাই জাতীয়করণের পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে কারিগরি শিক্ষাকে মাধ্যমিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে সারা বছরের ধারাবাহিক মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে। ডিজিটালাইজেশনের নামে শিক্ষার্থীদের হাতে ডিভাইস তুলে দিলেই হবে না। একই সঙ্গে কাগুজে বই এমনকি হাতে-কলমে শিক্ষার প্রচলনটিও চালু রাখতে হবে। সুইডেনের সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এর গুরুত্ব অনুধাবন করেছে। চালু হয়েছে কাগুজে বই দিয়ে পাঠদানও। বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক ব্যবস্থা, মূল্যায়নকে তদারকির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটিকে যেন নজরদারিমূলক না করা হয়। এমনকি শিক্ষা কারিকুলামেও পরিবর্তন আনতে হবে। শারীরিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো সৃজনশীল শিক্ষায় উৎসাহী কো-কারিকুলাম রাখতে হবে। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকে জোর দিয়ে ভাষা, যোগাযোগ, সৃজনশীলতা, সফট স্কিল উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রযুক্তি সাক্ষরতা ইত্যাদি বিষয়কে কো-কারিকুলামে যুক্ত করতে হবে। এসব বিষয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উৎসাহমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করতে হবে।

শুধু বিদ্যালয় প্রস্তুত করলেই হবে না। সেগুলোর গুণগত বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করার মতো করে বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায় জোর দিতে হবে। মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার একটি বড় কারণ যদি হয় গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভাব, তাহলে এর সমাধান রাষ্ট্রকেই দিতে হবে। এ বিষয়ে নতুন সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে। তবে এগুলো তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রতিটি উদ্যোগের পেছনে থাকবে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা। জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে আগামী বাজেট থেকেই সেই লক্ষ্যে স্পষ্ট পথনকশা দেখাতে হবে। বিশেষত মাধ্যমিক স্তরে গ্রামীণ বিদ্যালয় নির্মাণ, শিক্ষক সংকট সমাধান এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তাকে বাজেটের অগ্রাধিকারে রাখতে হবে।