কেবল শিল্পায়ন নয়, অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজেও অর্থায়ন করা হয়। এর অন্যতম কারণ শিল্পায়ন বা যেকোনো বড় প্রকল্প দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হয় এবং এতে নানা ঝুঁকিও থাকে। আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারের সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার প্রায় সাত দশক পরেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎসে পরিণত হয়নি।

এর পেছনে বহুমুখী কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম দেশের আর্থিক নীতিতে ব্যাংক খাতকে কেন্দ্রে রাখা এবং এটিকে অর্থায়নের প্রধান উৎস করে তোলা হয়েছে। এতে পুঁজিবাজার বিকল্প উৎস হিসেবেও সেভাবে দাঁড়াতে পারেনি। এটা এক ধরনের নীতিগত দুর্বলতা, যার কারণে পুঁজিবাজার থেকে শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য হারে অর্থায়ন হচ্ছে না। অন্যদিকে অর্থায়নের জন্য চাপ পড়েছে ব্যাংক খাতের ওপর। ব্যাংক খাত থেকে বিপুল অংকের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঋণ বিতরণে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিও হয়েছে। ফলে খাতটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে এবং এটি ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুড়ে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থায়নের উৎস হিসেবে কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলা।

গত পাঁচ দশকে পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মোট স্থায়ী মূলধনের ৬ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ পরিসংখ্যান পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি কতটা নিম্নমুখী সেটাই প্রকাশ করছে। সরকারের উচিত পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নয়নে মনোযোগ দেয়া। ভঙ্গুর ব্যাংক বা আর্থিক খাত দিয়ে দেশের অগ্রগতি কখনই টেকসই হয় না। যে কারণে উন্নত দেশগুলো পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট, ব্যাংক খাত অর্থাৎ বহুমুখী অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করেছে। এতে কোনো একক উৎসের ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয় না এবং কোনো একক খাতের ভঙ্গুর হয়ে পড়ার নজিরও কম। তাছাড়া এক খাতের পরিস্থিতি নাজুক হলে অন্য খাত থেকে পুঁজিপ্রবাহ ঠিক রাখা যায়। সরকারের উচিত এগুলো বিবেচনায় নিয়ে নীতি কৌশল সাজানো। পুঁজিবাজারের কার্যকর বিকাশ না হওয়ার পেছনে যেসব কাঠামোগত দুর্বলতা ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে তার সমাধানে কাজ করা।

দীর্ঘদিন ধরে সহজলভ্য ব্যাংক ঋণ উদ্যোক্তাদের পুঁজিবাজারবিমুখ করেছে। কিন্তু এর ফল এখন স্পষ্ট। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি তহবিল ব্যবহার ব্যাংক খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এমন একটি প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাজারের শক্তিশালী উপস্থিতি থাকা জরুরি ছিল, যা অর্থনীতিকে একটি বিকল্প ও টেকসই অর্থায়ন কাঠামো দিতে পারত। পুঁজিবাজারে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কারণে এটি সে উৎস হতে পারেনি।

এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা সুশাসনের ঘাটতি। ফলে আস্থার সংকট তীব্র হয়েছে। অতীতের নানা অনিয়ম-কারসাজির কারণে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানো যায়নি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যে উল্লেখ রয়েছে, আইপিওর মাধ্যমে সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নয়টি কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে ৮৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। এ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক থেকে এখন পর্যন্ত আইপিওর মাধ্যমে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি।

অথচ পুঁজিবাজারের উন্নয়নে সবসময়ই ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে আসছে। কিন্তু সুশাসন ও আস্থার ঘাটতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ভালো কোম্পানির অন্তর্ভুক্তিতে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। ভালো কোম্পানির শেয়ারের অভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। আবার দুর্বল কোম্পানির শেয়ারদরে অনেক সময় কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক ওঠানামা পরিলক্ষিত হয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা এ শেয়ারদর দেখে বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হন, যার প্রভাব পুঁজিবাজারেও পড়ে। পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ মোটাদাগে, সুশাসনের ঘাটতি পুঁজিবাজারের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ বছর অতিক্রম করলেও পুঁজিবাজারে বহুমাত্রিক পণ্যের বিকাশ হয়নি। আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানির তালিকাভুক্তি থেকে শুরু করে বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, ডেরিভেটিভস ও কমোডিটির বৈচিত্র্যপূর্ণ বাজার গড়ে ওঠেনি। যে কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা ও গুণগত মানও কম এবং পুঁজিবাজার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে খুব বেশি সফল হতে পারেনি। ফলে বড় শিল্প প্রকল্প কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নে পুঁজিবাজার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।

এ বাস্তবতায় পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এজন্য সরকারকে বেশকিছু উদ্যোগ নিতে হবে। প্রথমত, পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর, স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অনিয়ম ও কারসাজির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বিশেষত বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পুঁজিবাজারকে দাঁড় করানোর প্রয়াস দৃশ্যমান হওয়া উচিত। এতে অন্তত পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশার সঞ্চার হতে পারে।

দ্বিতীয় জরুরি কাজ হতে হবে ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে গুরুত্ব দেয়া। আস্থা পুনরুদ্ধার করা গেলে কাজটিও কিছুটা সহজ হয়ে আসবে বলে ধারণা করা যায়। এর বাইরে আইপিও প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও পূর্বানুমানযোগ্য করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা সময়মতো অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর-প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা বাড়ানো যেতে পারে।

পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে বৈচিত্র্যময় করতে বন্ড মার্কেটকে আরো শক্তিশালী করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে করপোরেট বন্ডের আওতা বাড়ানোসহ অবকাঠামো বন্ড, মিউনিসিপ্যাল বন্ড, জলবায়ুবান্ধব বন্ড ও সিকিউরিটাইজেশন চালু করা জরুরি। এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে। বড় বিনিয়োগ প্রকল্পে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের মধ্যে একটি নীতিগত ভারসাম্য

তৈরি করতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট অংশ পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন করা বাধ্যতামূলক হয়। এতে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমবে এবং পুঁজিবাজারের কার্যকারিতা বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বা জাপানে পুঁজিবাজারই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রধান উৎস, যেখানে ব্যাংক খাত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। একইভাবে ভারত, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনাম পুঁজিবাজারকে বহুমাত্রিক করে তাদের বিনিয়োগ কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এ পথ অনুসরণ করা জরুরি।

সবশেষে পুঁজিবাজারকে কেবল শেয়ার কেনাবেচার প্লাটফর্ম হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতির একটি কেন্দ্রীয় অর্থায়ন অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ব্যাংকনির্ভর কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়ন এবং আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসা তাই জরুরি হয়ে পড়েছে।