এর কারণ হিসেবে গ্যাস লিকেজের কথা জানা যায়। এ ঘটনায় বিস্ফোরক পরিদপ্তর পাম্পের মালিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটির এজাহারে গ্যাস পাম্পটির জেলা প্রশাসনের অনাপত্তিপত্র, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের অনুমতিপত্র এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স নেই বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই ফিলিং স্টেশনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এ চিত্র কেবল কলাতলীর ফিলিং স্টেশনের নয়, দেশে প্রায় ১ হাজার ১০০ অটোগ্যাস স্টেশন চালু রয়েছে। এ স্টেশনগুলোয় প্রতিদিন লক্ষাধিক যানবাহন জ্বালানি নেয়। অথচ ৯০ শতাংশ স্টেশনেরই বৈধ কাগজপত্র বা ব্যবসা পরিচালনার চূড়ান্ত সনদ নেই বলে সম্প্রতি ‘রাউন্ডটেবিল অন বাংলাদেশ এলপিজি সেক্টর ফেসিং গ্রোয়িং সেফটি অ্যান্ড রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক এক আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরিপূর্ণ কমপ্লায়েন্স না মেনে নির্মাণ হওয়া ফিলিং স্টেশনগুলোয় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েই চলেছে।

বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় পরিসংখ্যানে নজর দিলে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে দেশে প্রতি বছর অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা বাড়ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২৭ হাজার ৫৯টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ৬৫৯। এসব অগ্নিকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য একটি অংশে রয়েছে ফিলিং স্টেশনের নাম। সংস্থাটির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর ৪০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ফিলিং স্টেশনে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এর আগের বছর তথা ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩০। অর্থাৎ ফিলিং স্টেশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাড়ছে। এ ঝুঁকি কমিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন অবৈধ ফিলিং স্টেশনগুলো অপসারণ করা এবং কোনো ফিলিং স্টেশন যেন প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও কাগজপত্র ছাড়া চলতে না পারে সে বিষয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া। পাশাপাশি প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলো জোরদার করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়া যদি ফিলিং স্টেশন স্থাপন বন্ধ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরো বড় দুর্ঘটনা অনিবার্য।

অটোগ্যাস বা গাড়িতে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) একটি দাহ্য পদার্থ। এর সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণে সামান্যতম অসতর্কতাও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এরই মধ্যে বিভিন্ন স্থানে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে, মানুষ হতাহত হয়েছে, আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে দেশ। তার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। অনেক স্টেশনে এখনো গ্যাস ডিটেকশন ব্যবস্থা নেই, যা ন্যূনতম নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য।

তবে এ পরিস্থিতিকে একদিক দিয়ে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে কিছু ব্যবস্থাপনাগত জটিলতায়ও রয়েছে। একটি অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপন করতে গেলে বিস্ফোরক পরিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বহু দপ্তরে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়। এ দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের জন্য ক্লান্তিকর ও ব্যয়বহুল। বর্তমানে প্রায় ৭০০ অটোগ্যাস স্টেশন বিস্ফোরক এবং বিইআরসির লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় আছে বলেও ওই আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর লাইসেন্স-সংক্রান্ত বিষয়গুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।

আবার যেহেতু নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নজরদারিতেও দুর্বলতা রয়েছে, তাই নিয়ম-বহির্ভূতভাবে একের পর এক ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা সহজ হয়েছে। এটিও ব্যবসার পরিবেশ সহজ ও সুষ্ঠু না হওয়ার একটি উদাহরণ।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বিদ্যমান স্টেশনগুলোর সনদ প্রদানে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ওয়ান স্টপ সেবা চালু করতে হবে। বহু দপ্তরে ঘোরার যে দুর্ভোগ, তা কমিয়ে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার আওতায় আনাই সঙ্গত। দ্বিতীয়ত, নীতিমালা ও বিধিমালা বাস্তবমুখী করে সংশোধন করতে হবে। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে জরুরি হলো নজরদারি কাঠামো শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যক্রমে যে দায়িত্বশীলতার অভাব রয়েছে সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অবশ্য এক্ষেত্রে সংস্থাটির দাবি হলো তাদের পর্যাপ্ত জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এটি বিবেচনায় নিয়ে বিইআরসিকে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেয়াও দরকার। সংস্থাটিতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিতে হবে এবং সহায়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সারা দেশের স্টেশনগুলোকে একটি ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনা সমীচীন হবে। এর বাইরে গ্যাস ডিটেকশন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এর বাস্তবায়নে কোনো আপস করা যাবে না।

কমপ্লায়েন্স মেনে যেতে ফিলিং স্টেশন স্থাপন হয় সেজন্য কিছু দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপও বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এলপিজি স্টেশন সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্কছাড়ের সুবিধা সহজলভ্য করতে হবে, এ খাতের ব্যবসায়ীরা মানসম্পন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারে উৎসাহিত হয়। তবে ব্যবসায়ীদেরও দায়বদ্ধ থাকা উচিত। কেবল মুনাফার চিন্তা না করে জননিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেবল তাই নয়, যখন একটি ফিলিং স্টেশন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে সেটি ব্যবসায়িক ক্ষতিও বটে। অর্থাৎ ব্যবসার স্বার্থেও নিয়ম-নীতির পরিপালন অপরিহার্য। একই সঙ্গে লোয়াবের মতো শিল্প সংগঠনকেও নিজেদের সদস্যদের কমপ্লায়েন্স মেনে চলতে বাধ্য করার দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না।

অটোগ্যাস খাতটি দেশের জ্বালানি খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের সময়ে এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো দরকার। কিন্তু সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও বাড়বে, এটা কাম্য নয়। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে।