প্রায় দেড় দশক আগে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত সরকার। সেই উদ্যোগের আওতায় গৃহীত ‘ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প সর্বশেষ একনেক সভায় অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ৪০৭ শতাংশ বাড়িয়ে প্রকল্পটির ব্যয় নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। বিপুল অংক ব্যয়ে নেয়া এ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেক। প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া নিয়েও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুই দিক থেকে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বিবেচনায় রিফাইনারির গুরুত্ব কোনো অংশে ছোট করে দেখছেন না জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তবে সারা বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক এ ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তায় এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্প কতটুকু অর্থনৈতিকভাবে সফলতা এনে দেবে তা নিয়ে আরো বিস্তর আলোচনা হতে পারে।

১৯৬৮ সালে বাংলাদেশে ইস্টার্ন রিফাইনারি নির্মাণ করা হয়। এই রিফাইনারির কার্যক্ষমতা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি দীর্ঘ ৫৭ বছরেও কেন জ্বালানি নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে আরো আগে রিফাইনারি নির্মাণ করা গেল না তা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। রিফাইনারি নির্মাণে বলা হচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু কেন এ ধরনের প্রকল্পে বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়া গেল না সেই বিষয়টিও কিন্তু আলোচনার প্রয়োজন। দুটি প্রশ্ন এখানে থাকতে পারে—প্রথমত, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রযুক্তিতে উন্নয়ন সহযোগীরা আর হয়তো বিনিয়োগ করতে চান না। দ্বিতীয়ত, যে প্রযুক্তি কিংবা সম্প্রসারণ হচ্ছে তাতে ঋণ দিয়ে পুনরায় ফেরত পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েও হয়তো দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। কিংবা এ প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা হয়তো প্রকল্পের আদর্শিক ব্যয়ের চেয়ে তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ ব্যয় নিয়ে বিশ্বের একই সক্ষমতার অন্যান্য রিফাইনারি ব্যয় কী হয়েছে তা তুলনা করে দেখা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে জাম্বিয়া ও অ্যাঙ্গোলার মতো দেশের তুলনায় এ ব্যয় ১৩৯ শতাংশ বেশি। এখন দেশ দুটির রিফাইনারি সক্ষমতা ও বৈচিত্র্য নিয়ে নানাভাবে আলোচনা করা যেতে পারে। এমনকি প্রযুক্তিগত সুবিধা, অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ, নির্মাণসামগ্রী ব্যয়, মুদ্রার বিনিময় হারসহ নানা বিষয় আসতে পারে। সেসব দিক বিবেচনায়ও কিন্তু ইস্টার্ন রিফাইনারি ব্যয় তুলনামূলক বেশি।

দেশে মেগা প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি, দেশের অর্থনীতির সংকট বিবেচনায় আর বড় কোনো প্রকল্প না নেয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। সর্বশেষ একনেক সভায় ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের এমন একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব যেখানে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখা, সেখানে এত বড় মেগা প্রকল্প অনুমোদন সময়োচিত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ মেগা প্রকল্প-পরবর্তী সরকারের জন্য এক ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে মেগা প্রকল্পগুলোয় মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। দেশের সবচেয়ে আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি পদ্মা সেতু। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। সেতুটি নির্মাণে স্বাভাবিকের চেয়ে দু-তিন গুণ বেশি অর্থ খরচ হয়েছে বলে মনে করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ‌পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমজাতীয় সেতুর কিলোমিটারপ্রতি নির্মাণ ব্যয় হিসাব করলে দেখা যাবে পদ্মা সেতু নির্মাণে দুই-তিন গুণ বেশি খরচ হয়েছে। কেন বেশি খরচ হয়েছে তা খুঁজলে দেখা যাবে এ প্রকল্পের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও এমন নজির পাওয়া যাবে না। প্রকল্পের কর্মকর্তা, সচিবদের থাকার জন্য বাংলো বানানো হয়েছে। এমন নানা অকার্যকর অনুষঙ্গের জন্য বিপুল পরিমাণ জায়গা অধিগ্রহণ করে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।

শুধু পদ্মা সেতু নয়, প্রত্যেক প্রকল্পেই এমন ‘‌শ্যাডো কস্ট’ নির্মাণ ব্যয় বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতে আট লেনের জাতীয় বা প্রাদেশিক মানের এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ১৫ লাখ ডলার। জেলা ও শহরাঞ্চলের জন্য দুই লেনের প্রতি কিলোমিটার সড়ক তৈরিতে ব্যয় হয় প্রায় ৬ লাখ ডলার। প্রান্তিক সড়কের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ ব্যয় পড়ে প্রায় ৪ লাখ ডলার। সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, দক্ষ জনশক্তি, নির্মাণ উপকরণ ও যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহারসহ নানা কারণে এশিয়াসহ পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে কম খরচে সড়ক তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে ভারত। ঠিক উল্টো অবস্থা বাংলাদেশের। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ সবচেয়ে ব্যয়বহুল। এখানে প্রতি কিলোমিটার চার বা ততোধিক লেনের সড়ক নির্মাণ করতে ২৫ লাখ থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলার পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। নির্মাণ ব্যয় বেশি হওয়ার জন্য উচ্চমাত্রায় দুর্নীতি, সময়মতো কাজ শেষ না হওয়া এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা না থাকাকে দায়ী করেছে বিশ্বব্যাংক।

শুধু সড়কপথই নয়, মেট্রোরেল নির্মাণেও অন্যান্য দেশের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। ঢাকার প্রথম মেট্রো নির্মাণে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার তিন ভাগের এক ভাগ দিয়ে প্রথম মেট্রো তৈরি হয় ভারতের দিল্লিতে। ঢাকা এমআরটি-৬-এর অর্ধেকেরও কম খরচে লাহোরে প্রথম মেট্রো তৈরি করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে প্রথম মেট্রো তৈরি করেছে চীন। দেশটির সাংহাই শহরের প্রথম মেট্রোটির নির্মাণ ব্যয় ঢাকার এমআরটি-৬-এর নির্মাণ ব্যয়ের পাঁচ ভাগের এক ভাগ। ঢাকার চেয়ে কম খরচে দুটি মেট্রোরেল নির্মাণ করা হচ্ছে ভিয়েতনামের দুটি শহরে। ঢাকায় নির্মাণাধীন দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেট্রোরেলের নির্মাণ ব্যয় আরো বেশি।

ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পটির কাজ এখনো শুরু না হলেও এরই মধ্যে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এর বড় অংশই ব্যয় হয়েছে পরামর্শক নিয়োগ, প্রস্তাবনা প্রণয়ন ও নকশা তৈরির পেছনে। ফ্রান্সের টেকনিপকে নকশা প্রণয়নের দায়িত্ব ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট (পিএমসি) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিশ্চিত না করে পরামর্শক খাতে বিপুল অংকের ব্যয় করা আর্থিক শৃঙ্খলা ও জনস্বার্থবিরোধী। উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই ব্যয় তখনই যুক্তিসংগত হয়, যখন প্রকল্প বাস্তবায়নের স্পষ্ট সময়সূচি ও অর্থায়নের নিশ্চয়তা থাকে।

এ পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা হয়নি। দেশের এমন একটি কৌশলগত জ্বালানি প্রকল্পে কেন স্থানীয় বা প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে পরামর্শক নির্বাচন করা হয়নি, সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো মেলেনি। ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং কাজ শুরু না করেই বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঘটনা কোনোভাবেই উচিত হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব মূলত একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ তৈরি করা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ সময় দীর্ঘমেয়াদি, বিতর্কিত ও বিপুল অর্থের প্রকল্প অনুমোদন পরবর্তী সরকারের জন্য নীতিগত ও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, সরকারের শেষ সময়ে নেয়া অনেক সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।