কোনো দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম নির্দেশক হলো সাক্ষরতার হার। প্রায় শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনকারী দেশগুলোর দিকে তাকালে তা আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়া, কাজাখস্তান, আজারবাইজান, অ্যান্ডোরাসহ আরো কয়েকটি দেশ এরই মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করেছে। অনেক দেশ এক্ষেত্রে প্রায় শতভাগের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কার্যকর নীতি ও তা বাস্তবায়ন এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এসব দেশ সাক্ষরতা হারের তালিকার শীর্ষ অবস্থান করছে। অন্যদিকে কার্যকর ও ধারাবাহিক নীতি-কৌশলের অভাব, নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা, দরিদ্র ইত্যাদি কারণে বহু দেশে এখনো মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থাই গড়ে ওঠেনি। ফলে শতভাগ সাক্ষরতার লক্ষ্য অর্জনে বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। যদিও সাক্ষরতার হারে পিছিয়ে থাকা অনেক দেশেই প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি সে ঘোষণা সংবিধান সিদ্ধও। বাংলাদেশের সংবিধানেও সে কথারই উল্লেখ পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়েছে, প্রতিটি শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজও প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈষম্যমূলক ও সর্বজনীন করা যায়নি। এ থেকে অনুমান করা যায়, এ দেশে সাক্ষরতার হার কোন অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৩ দশমিক ৫১ শতাংশ কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি বলে হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে ২০২৫-এর তথ্যে উঠে এসেছে। এ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ১৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলেও তা সম্পন্ন করতে পারেনি। সে হিসাবে মোট ৪২ দশমিক ৪৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণীর নিচে। এসব তথ্য বেশ উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যাদের সাক্ষরজ্ঞান রয়েছে বলে দাবি করা হয়, তারা কতটা কার্যকরভাবে সে জ্ঞান কাজে লাগাতে পারে সেটি নিয়ে শিক্ষাবিদদের অনেকেই সন্দিহান। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরক্ষর রেখে দেশ কতদূর এগোবে সেটিও চিন্তার বিষয়।
চলতি বছর পাশের দেশ ভারতের মিজোরাম রাজ্য শতভাগ সাক্ষরতার মর্যাদা পেয়েছে। এ রাজ্যে সাক্ষরতার হার দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ২ শতাংশে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং লাইফলং লার্নিং ফর অল সোসাইটি’ এবং ‘নিউ ইন্ডিয়া লিটারাসি প্রোগ্রাম’ নামক উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে। জানা যায়, ২০১১ সালে মিজোরামে অক্ষরজ্ঞান নেই এমন মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৬। এদের মধ্যে ১ হাজার ৬৯২ জন নাগরিক শিখতে-পড়তে আগ্রহী ছিলেন। তাদের সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন করতেই নেয়া হয় বিশেষ ওই উদ্যোগগুলো। এ উদ্যোগে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীসহ অনেকেই। তারা নিরক্ষর নাগরিককে প্রয়োজনীয় সব শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ ও প্রতিকূলতা দূর করতে সহযোগিতা করেছেন। সবার সহযোগিতায় মিজোরাম শতভাগ সাক্ষরতাসম্পন্ন রাজ্য হয়ে উঠেছে।
মিজোরাম মূলত সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষার কার্যকারিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অর্থাৎ রাজ্যটি এক এক করে তাদের কাছে পৌঁছেছে, যারা নানা প্রতিকূলতায় পড়ালেখায় পিছিয়ে ছিলেন। মডেলটির প্রয়োগ দেশে করা যেতে পারে। নিরক্ষর বা পঞ্চম শ্রেণীর গণ্ডি পেরোতে পারেনি এমন নাগরিকদের চিহ্নিত করে তাদের কাছে পৌঁছে যাওয়া একটা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে।
বিগত সময়ে দেশে সাক্ষরতা হার বৃদ্ধিতে নানা উদ্যোগ নিতে দেখা গেছে। কিন্তু কোনোটাই খুব বেশি ফলপ্রসূ হয়নি। এক্ষেত্রে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দুর্বলতার বড় দায় রয়েছে। সেই সঙ্গে কার্যকর নীতিরও অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর (বিএনএফইউ) তথ্যানুযায়ী, ১৯৯০-২০২৫ সাল পর্যন্ত সাক্ষরতা বৃদ্ধি, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষা নিশ্চিতে ১১টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। এত প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক পর্যায়েরও নিচে হওয়াটা সে চিত্রই তুলে ধরে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ও তদারকির অভাবেই প্রকল্পগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসেনি। তবে দারিদ্র্যও এর অন্যতম কারণ বলে তাদের অনেকের অভিমত।
এটি সত্য, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার মধ্যে এক ধরনের সংযোগ রয়েছে। কারণ দরিদ্রতার ফলে অনেকেই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। দরিদ্র দেশগুলোর দিকে তাকালে এর স্বরূপ আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথিবীর দরিদ্র দেশগুলোয় সাক্ষরতার হারও অনেক কম। নিম্ন সাক্ষরতার হার রয়েছে এমন বেশির ভাগ দেশই দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলে অবস্থিত। আবার এসব অঞ্চলে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোরও অবস্থান লক্ষ করা যায়। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, দেশে নিরক্ষরতার হার সবচেয়ে বেশি বান্দরবানে, ৩৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এ জেলায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও তুলনামূলক বেশি। এমনকি কোনো দরিদ্র পরিবারের সন্তান বিদ্যালয়ে পড়লেও তাকে জীবিকার তাগিদে রোজগারের পথেও যেতে হয়।
দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার সংযোগের কারণেই প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করার উদ্যোগ দেশে দেশে নেয়া হয়েছে তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় মিড ডে মিল বা স্কুল ফিডিংয়ের মতো প্রোগ্রাম চালু রয়েছে, যেন দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের সুরক্ষা দেয়া যায় এবং তারা বিদ্যালয়ে যেতেও আগ্রহী হয়। কিন্তু দেশে এমন প্রোগ্রাম তো দূরের কথা, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। আবার দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকাগুলোয় সাক্ষরতার হার বাড়াতে সরকারি উপবৃত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীদের যে পরিমাণ উপবৃত্তি দেয়া হয়, দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান মূল্যস্ফীতি ও শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলোর আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় তা যৎসামান্য। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা হয়ে উঠেছে বৈষম্যমূলক ও ব্যয়বহুল। সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় মানহীনতার কারণে অভিভাবকরা ঝুঁকেছেন বেসরকারি বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার দিকে। মাধ্যমিক ও উচ্চস্তরের শিক্ষার মান নিয়েও রয়েছে চরম অসন্তোষ। অথচ শিক্ষাই যেকোনো অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে হলে প্রয়োজন কিছু সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। এজন্য শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধিও আবশ্যক। সর্বোপরি সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।










