বন্দরে পণ্য জাহাজীকরণ বা খালাস, সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহন, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইত্যাদির কার্যকর সমন্বয়ে যে দক্ষ লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন, তাতে আজও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। সেটির একটি বাস্তব উদাহরণ হলো কমলাপুরের ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি)। বর্তমানে বাণিজ্যের আকারের তুলনায় এর ধারণক্ষমতা কম। কেবল তাই নয়, রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও রেলের অবকাঠামোগত সংকটের কারণে এর প্রয়োজনীয়তা আরো কমে গেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো এ খাতের মানোন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো বিশেষ পরিকল্পনা বা উদ্যোগও দৃশ্যমান নয়, এর একটি উদাহরণ হলো গাজীপুরের ধীরাশ্রমে নেয়া আইসিডি প্রকল্প, যার বাস্তবায়ন বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে। অথচ রেলপথে পণ্য পরিবহন এবং আইসিডির সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল।

লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কেননা আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা, দ্রুততম সময়ে পণ্য খালাস, সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বাড়ে। একই সঙ্গে শিল্প খাতে কাঁচামাল পরিবহন সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হয়। ফলে উৎপাদন ও রফতানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর পরও দেশের লজিস্টিক খাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগ না থাকাটা হতাশাজনক। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে (এলপিআই) উল্লেখ করা হয়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। অথচ পাশের দেশ ভারতও এক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। এ সূচকে ভারতের অবস্থান ছিল ৩৮তম। বাংলাদেশকে এ অবস্থান থেকে সামনে এগোতে হলে অবশ্যই লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দিতে হবে, যার অন্যতম অংশ হলো কনটেইনার হ্যান্ডলিং। সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে ধীরাশ্রম আইসিডির কাজ সম্পন্ন করে তা চালু করা। সেই সঙ্গে কমলাপুর আইসিডির সীমাবদ্ধতা দূরীকরণের আশু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ কনটেইনার ঢাকায় আনা হয়। এর অধিকাংশই আসে সড়কপথে। এতে মহাসড়কে ও ঢাকার অভ্যন্তরের সড়কে চাপ বেড়ে যেত। কালক্ষেপণও হতো বেশি। এ চাপ কমাতে ধীরাশ্রমে আইসিডি চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে রেলপথ তুলনামূলক সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও দক্ষ হলেও সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা সংকটে তার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কমলাপুর আইসিডি রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে ট্রাক চলাচল, কনটেইনার খালাস, গুদামজাত এবং নগর ট্রাফিক—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি হয়। ঢাকার ভেতরে কনটেইনার পরিবহন নিজেই একটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ধীরাশ্রম আইসিডি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের নিকটে অবস্থান, বাইপাস সড়কের সংযোগ, রেল নেটওয়ার্কের সুবিধা এবং রাজধানীর বাইরে অবস্থান—সব মিলিয়ে এটি একটি আধুনিক ড্রাই-পোর্ট হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এতে চট্টগ্রাম থেকে আসা কনটেইনার সরাসরি ঢাকার ভেতরে প্রবেশ না করেও খালাস ও বিতরণ করা সম্ভব হবে। শিল্পাঞ্চলভিত্তিক কারখানাগুলো দ্রুত কাঁচামাল পাবে, রফতানিকারকরা সময়মতো পণ্য পাঠাতে পারবেন, আর রাজধানীর ওপর চাপ কমবে।

লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনার মূল বিষয় হলো সময় ও ব্যয়সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্যতা। বাংলাদেশ এ তিন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে, যদি উন্নতির সুযোগও রয়েছে। বন্দরে জট, সড়কে যানজট, রেলের সীমিত সক্ষমতা, কাস্টমস জটিলতা এবং বিচ্ছিন্ন ডেটা ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থার মোট সময় ও খরচ বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে, রফতানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় ও বিনিয়োগ পরিবেশে।

রেলপথে পণ্য পরিবহন তুলনামূলক সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব—এ কথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু দেশের রেলপথের চিত্রে এ কথার প্রতিফলন দেখা যায় কদাচিৎ। যখন সময়মতো ট্রেন পাওয়া যায় না, ইঞ্জিনের অভাবে কনটেইনার পড়ে থাকে, বন্দরে জট তৈরি হয় এবং এসব কারণে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েন, তখন তারা বিকল্প পথ খুঁজবেন—এটাই স্বাভাবিক। ফলও দৃশ্যমান। একসময় যেখানে দেশের কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ১০ শতাংশ রেলে হতো, এখন তা ৪ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। রেলপথে কনটেইনার পরিবহন ও ব্যবসায়ীদের আস্থায় ভাটা নামার কেন্দ্রে রয়েছে কার্যকর নীতি-কৌশলের অভাব। রেলওয়ের বিনিয়োগের বড় অংশ গেছে যাত্রীসেবা ও অবকাঠামোয়। আর পণ্য পরিবহন খাত থেকেছে উপেক্ষিত। দৈনিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকোমোটিভ না থাকায় পণ্যবাহী ট্রেন অনিয়মিত চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। এগুলো ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা দুর্বলতা। ধীরাশ্রম আইসিডি কার্যকর করতে হলেও রেল খাতের এসব অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা অপরিহার্য। নয়তো রেলপথে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যাবে না। আর এটি না হলে আইসিডি তৈরির লক্ষ্যও পূরণ হবে না। এজন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ, নিয়মিত মালবাহী ট্রেন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, কাস্টমস সমন্বয়, বেসরকারি অংশগ্রহণ এবং পেশাদার অপারেশন মডেল। অন্যথায় নতুন অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়বে না। এগুলোর পাশাপাশি ধীরাশ্রম আইসিডির কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।

কয়েক বছর আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় ধীরাশ্রমে নতুন আইসিডি নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, কমলাপুর আইসিডির সীমিত ধারণক্ষমতা, ঢাকার যানজট, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক রফতানি চাহিদা এবং ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক ট্রানজিট ব্যবস্থার কথা বিবেচনায় এ প্রকল্প অত্যন্ত জরুরি। পরিকল্পনা ছিল, চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকামুখী কনটেইনারের বড় অংশ রেলপথে এনে সড়কের ওপর চাপ কমানো হবে। এমনকি রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের হার ১০-৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে, রেলওয়ে এখন কনটেইনার পরিবহনে আগের অবস্থানও ধরে রাখতে পারছে না।

এ বাস্তবতা দেখায় লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা আজও উপেক্ষিত। ধীরাশ্রম আইসিডি প্রকল্প যদি নির্ধারিত সময়ে এগোত, তবে কমলাপুরের ওপর চাপ অনেকটাই কমানো যেত, ঢাকার যানজটও হ্রাস পেত, শিল্পাঞ্চলগুলো দ্রুত সেবা পেত এবং রেলপথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ত। দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশের প্রেক্ষাপটে লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা বর্তমানে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতার বড় সীমাবদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। ফলে এর মানোন্নয়ন হওয়াটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।