পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, বাংলাদেশ এখনো হাম সংক্রমণের ‘উচ্চ ঝুঁকি’তে। কেন বাংলাদেশ উচ্চ ঝুঁকিতে সে কারণগুলো এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে তুলে ধরেছে জাতিসংঘের সংস্থাটি। সংস্থাটি বলেছে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনাই এ ঝুঁকির কারণ। আক্রান্তদের বড় অংশের টিকা নেয়া ছিল না। কারো কারো প্রথম ডোজ নেয়া থাকলেও দ্বিতীয় ডোজ নেয়া হয়নি। আগের অর্থবছরে দেশে এমআর টিকার ঘাটতি এবং পাঁচ-ছয় বছর ধরে দেশব্যাপী সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি অনিয়মিত হয়ে পড়ায় হামের ঝুঁকি বেড়েছে।
হাম সংক্রমণের সার্বিক চিত্র কেবল রোগের বিস্তার নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতের প্রতিরোধযোগ্যতা নিশ্চিত করার ব্যর্থতার দলিলও। কারণ প্রতিরোধযোগ্য রোগগুলোর মধ্যে হাম অন্যতম। সঠিকভাবে দুই ডোজ টিকা দিলে এ রোগ থেকে ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব। এ বাস্তবতা বাংলাদেশ একসময় বুঝেছিল। ২০০০ সালে হামের প্রথম ডোজের কাভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ। ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় তা ২০১৬ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১১৮ শতাংশে। এরপর দ্বিতীয় ডোজের কাভারেজ ২০১২ সালে ২২ শতাংশ থাকলেও দুই বছর পর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ১২১ শতাংশে পৌঁছেছিল। বিভিন্ন সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পোলিও, ধনুষ্টংকার নির্মূল করা গেছে। হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে এসেছে। হামও নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল এবং ২০২৫ সাল নাগাদ তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যও ছিল। দারিদ্র্য ও জনঘনত্বের বাধা এড়িয়ে এসব সাফল্য দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। অথচ এ অর্জনই আজ প্রশ্নের মুখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন স্পষ্ট বলছে, ২০২৪-২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দুটোরই কাভারেজ নেমে আসে। তাছাড়া ২০২০ সালের পরে দেশব্যাপী আর কোনো সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়নি। নিয়মিত কর্মসূচিতেও ফাঁক থেকে গেছে। ফলে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে এবং তাদের মধ্যেই হামের সংক্রমণ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এ ব্যর্থতার দায় নির্দিষ্ট কোনো সরকার বা সংস্থার একার নয়। তবে টিকা কেনায় অব্যবস্থাপনা ও পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার সরবরাহ-বিঘ্ন নীতিমালার বিষয়টি বর্তমান সরকার স্বীকার করেছে। কিন্তু দায়িত্ব বণ্টনের এসব আলোচনায় প্রতিদিন ঝরছে শিশুর জীবন। এজন্য প্রতিটি সংক্রমণ এক অনিবার্য ব্যর্থতার ফসল। তবে এখনো প্রতিরোধের সক্ষমতা হারিয়ে যায়নি। হাম সংক্রমণ পরিস্থিতির ঝুঁকিকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে কাজ করতে হবে এবং দ্রুত সব শিশুকে এ টিকার আওতায় আনার ব্যবস্থাপনাগত দিক নিশ্চিত করতে হবে।
হাম সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এরই মধ্যে সাড়া দিয়েছে। এটি ইতিবাচক। সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি চলছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখাচ্ছে ভোগান্তির চিত্র। সরকারি হিসাব বলছে, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুরা মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে হাজারের বেশি শিশুকে নিয়ে অভিভাবকদের দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। এক্ষেত্রে ভোগান্তি তো আছেই, সঙ্গে রয়েছে আতঙ্ক। আবার দেশে টিকাদান নিয়ে বিভিন্ন গুজবের প্রচলনও আছে। টিকাদানের বিষয়ে গুজব যেন ছড়াতে না পারে সেজন্য জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালু করতে হবে। পাশাপাশি শুধু টিকা কেনা বা কর্মসূচি চলমান ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই। সঠিকভাবে শিশুর কাছে টিকা পৌঁছাচ্ছে কিনা সেদিকে নজরদারি বাড়াতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো জনবল নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি পূরণ করা। স্বাস্থ্য সহকারীরা সঠিকভাবে মাঠে কাজ করছেন কিনা, তা নিয়মিত যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের টিকাদান কর্মসূচিতে যুক্ত করতে হবে। ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন, ইউনিয়ন থেকে উপজেলা—প্রতিটি স্তরে নজরদারির জবাবদিহি থাকতে হবে। কোনো শিশু যেন তালিকার বাইরে না থাকে, সেজন্য সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও হালনাগাদের ব্যবস্থা থাকা চাই। এজন্য আলাদা ডেটাবেজ করা যেতে পারে। সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোয় জনবল সংকট সমস্যা দ্রুত নিরসন করা না গেলে বেসরকারি খাতকে কৌশলগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগুলোও সচল করার বিকল্প নেই। দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোতে অনেক বিনিয়োগ হলেও সেগুলোয় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে এসব অবকাঠামো অব্যবহৃত অবস্থায় ‘পড়ে’ আছে। এসব অবকাঠামোতে দক্ষ জনবল নিয়োগ, নিরলস তদারকি ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কিংবা আনুষ্ঠানিকতার দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতি আরো কঠিন দিকে নিতে পারে। এ বিষয়ে সরকারকে আশু কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। এছাড়া টিকা কেনার পর কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা সেটিতেও মনোযোগ রাখতে হবে। হামের টিকা তাপমাত্রা সংবেদনশীল। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে কার্যকারিতা হারায়। এদিকে দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে কোল্ড চেইন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বহু পুরনো সমস্যা। এ দুর্বলতা এড়াতে না পারলে কোটি কোটি টাকার টিকা মাঠে পৌঁছে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার ক্ষেত্রে কমিউনিটি পর্যায়কে কাজে লাগাতে হবে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকার ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ টিকাদান দলের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি। রোহিঙ্গা ক্যাম্প, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি দুর্গম এলাকাগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শহরের বস্তি এলাকায় যেখানে টিকাদান কর্মসূচির নাগাল কম, সেখানেও বিশেষ উদ্যোগ জরুরি। ডব্লিউএইচও বলছে, দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজারের মতো আন্তর্জাতিক যাতায়াতের কেন্দ্রগুলোয় সংক্রমণ ছড়ানোর বাড়তি ঝুঁকি আছে। কাজেই বিমানবন্দর, স্থলবন্দর এবং সীমান্ত পারাপারের পয়েন্টগুলোয় নজরদারি জোরদার করা দরকার। অভিভাবকদের সচেতন করতে মসজিদ, মন্দির, বাজার এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে কাজে লাগাতে হবে। এমনকি স্বাস্থ্যসেবার তথ্য অবাধ, স্বচ্ছ ও ভোগান্তিহীন করার জন্যও সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন।
হামের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু টিকার লড়াই নয়। শিশুদের অপুষ্টি এবং মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়া এ সংকটে মৃত্যুর ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। এজন্য টিকা দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং পুষ্টি, সচেতনতা এবং পরিবারের সম্পৃক্ততাও প্রতিরোধের লড়াইয়ের অংশ। হামের প্রাদুর্ভাবও সে কথাই বলছে। আবার নীতিনির্ধারকদের জন্য বার্তা, জনস্বাস্থ্যে ধারাবাহিকতা না থাকলে বিপর্যয় আসবে। একটি টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ হলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণ করতে কয়েক বছর লেগে যায়। কিন্তু ক্ষতি হয়ে যায় অনেক আগেই। এ ক্ষতির ঝুঁকি বিবেচনা করে সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। এটি শুধু স্বাস্থ্যের নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন।










