বাংলাদেশের নির্মাণসামগ্রী খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। নতুন সিমেন্ট কারখানা, আধুনিক রড মিল, উন্নত প্রযুক্তি এবং বৃহৎ বিনিয়োগ, সব মিলিয়ে এ খাতকে শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে। প্রচলিত ধারণা ছিল, উৎপাদনক্ষমতা ও বিক্রির পরিমাণ যত বেশি, প্রতিযোগিতায় অবস্থান তত দৃঢ়। কিন্তু ২০২৬ সালের বাস্তবতায় এসে এ ধারণাকে নতুন করে মূল্যায়ন করা অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে সিমেন্ট ও রড খাতের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ উৎপাদনে নয়, বরং সুষ্ঠু নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নগদ প্রবাহ বজায় রাখা। অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রি করছে ঠিকই, কিন্তু সেই বিক্রির অর্থ সময়মতো আদায় করতে পারছে না। ফলাফল, কাগজে-কলমে লাভ থাকলেও হাতে নগদ নেই, আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে গভীর আর্থিক চাপ।
বাংলাদেশে এখন সিমেন্ট ও স্টিল, দুই খাতেই উৎপাদনক্ষমতা বাজারের চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থাৎ এটি আর ঘাটতির বাজার নয়; বরং অতিরিক্ত সক্ষমতার বাজার। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতা সাধারণত দামের ছাড় এবং দীর্ঘমেয়াদি বাকিতে বিক্রির দিকে ঝুঁকে পড়ে। বাইরে থেকে এটি বিক্রি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও, বাস্তবে এটি আর্থিক দুর্বলতার ভিত্তি তৈরি করে।
সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু এখানেই। একটি কোম্পানি যদি বিক্রির অর্থ পেতে ৯০–১২০ দিন বা তারও বেশি সময় নেয়, তাহলে তার নগদ প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ একই সময়ে শ্রমিকের বেতন, কাঁচামালের মূল্য, জ্বালানি খরচ, ব্যাংক ঋণের কিস্তি এবং পরিবহন ব্যয়—সবকিছু নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে উৎপাদক থেকে অর্থায়নদাতায় পরিণত হয়—ডিলার ও গ্রাহকদের কার্যত সুদবিহীন অর্থায়ন দিয়ে বাজার সচল রাখে।
এ ঝুঁকি আরো তীব্র হয়েছে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে ব্যয়ের কাঠামো পুরোপুরি বদলে গেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বাজারের অনেক অংশগ্রহণকারী এখনো পুরনো ব্যবসায়িক অভ্যাসে পরিচালিত হচ্ছে, যা বর্তমান বাস্তবতায় আর টেকসই নয়।
ফলে একটি বড় অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে: উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু বিক্রয় কৌশল অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এর ফলে কিছু প্রতিষ্ঠান এমন দামে পণ্য বিক্রি করছে, যেখানে প্রকৃত খরচও পুরোপুরি উঠে আসছে না। এটি সাময়িকভাবে আক্রমণাত্মক বাজার কৌশল মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যালেন্স শিট দুর্বল করে এবং টেকসই প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।
সরকারি প্রকল্পভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থাও এ সংকটকে আরো জটিল করেছে। অনেক চুক্তি হয়েছিল তুলনামূলক কম ব্যয়ের সময়ে, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে উচ্চ ব্যয়ের পরিবেশে। তার ওপর যদি বিল পরিশোধে বিলম্ব ঘটে, তাহলে নগদ প্রবাহ আরো চাপে পড়ে। ফলে কাগজে বড় অর্ডার থাকলেও বাস্তবে তার আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় না।
এ প্রেক্ষাপটে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—মানসিকতার মৌলিক পরিবর্তন। প্রথমত, বিক্রির পরিমাণের পেছনে অন্ধ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। আজকের বাজারে সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড বিক্রির পরিমাণ নয়; বরং কত দ্রুত সেই বিক্রিকে নগদে রূপান্তর করা যায়, কতটা লাভ ধরে রাখা যায় এবং কতটা স্থিতিশীল নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করা যায়—সেটিই আসল সূচক।
দ্বিতীয়ত, কঠোর ক্রেডিট ডিসিপ্লিন প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। সব গ্রাহককে একই শর্তে বিবেচনা করা যাবে না। গ্রাহকভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন, নির্ধারিত ক্রেডিট সীমা এবং সময়মতো আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা—এসবকে ব্যবসার কেন্দ্রে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা হতে হবে আরো বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল। সাময়িক চাপের মধ্যে থাকা কিন্তু মৌলিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান কেবল ঋণের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে, তাদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
চতুর্থত, সরকারি প্রকল্পে বাস্তবসম্মত মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। জ্বালানি, পরিবহন ও বিনিময় হারের বড় পরিবর্তন যদি প্রকল্প মূল্যে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে তার পুরো চাপ উৎপাদকদের ওপর পড়ে এবং খাতের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
পঞ্চমত, শিল্পখাতে একীভবন নিয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা এখন সময়ের দাবি। প্রশ্ন হওয়া উচিৎ—আর কত নতুন কারখানা প্রয়োজন তা নয়; বরং কতগুলো আর্থিকভাবে সুস্থ, দক্ষ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এ বাজারকে টেকসইভাবে পরিচালনা করতে পারবে।
নির্মাণসামগ্রী খাত দেশের উন্নয়নের ভিত্তি। এ খাত অবকাঠামো গড়ে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করে এবং অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি করে। কিন্তু শুধুমাত্র বড় উৎপাদনক্ষমতা কোনো প্রতিষ্ঠানের শক্তির মাপকাঠি হতে পারে না। প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে—কতটা দক্ষতার সঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠান তার নগদ প্রবাহ পরিচালনা করতে পারে, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
সুতরাং আজ সিমেন্ট ও রড খাতের মূল প্রশ্ন উৎপাদন নয়—নগদ প্রবাহের দক্ষ ব্যবস্থাপনা। এ নতুন বাস্তবতায় সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সে, যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করে না; বরং সে, যে সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে তার নগদ অর্থ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ এবং প্রবাহ নিশ্চিত করতে পারে।
মোস্তাক আহমেদ: ক্লাস্টার চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস), আকিজ রিসোর্স










