দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি এবং তা থেকে উত্তরণের উপায়, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, আসন্ন বাজেটে করণীয় ইত্যাদি প্রসঙ্গে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা
আপনি দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি বর্তমানে কেমন দেখছেন?
সাধারণত যারা অর্থনীতিবিদ তারা সবসময় দারিদ্র্যকে আয়ের কমতি বা সম্পদ বণ্টনের মধ্যে ঘাটতি হিসেবে দেখেন। এটা দারিদ্র্যের একটা মাত্রিকতা। কোনো সন্দেহ নেই। তবে আমি দারিদ্র্যকে একটু ব্যাপ্তভাবে দেখি। এ অর্থে যে আসলে শুধু আয়ের কমতি বা সম্পদের ঘাটতি দারিদ্র্য নয়, এর অন্যান্য মাত্রিকতাও আছে। যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যদি একটা ঘাটতি থাকে, মানুষের যদি তার কণ্ঠস্বর ব্যবহারের জন্য একটা জায়গা না থাকে বা মানুষের জীবনে যে জিনিসগুলো মূল্যবান সেটাকে নির্ধারণ করার জন্য যে প্রক্রিয়া সেখানে অংশগ্রহণ না থাকে তাহলে সেটাও এক ধরনের বঞ্চনা। সুতরাং আমি মনে করি যে দারিদ্র্য বহুমাত্রিক এবং বঞ্চনাটা শুধু আয় কিংবা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আরেকটা দিক থেকে আমি দারিদ্র্যকে দেখি। সাধারণত আমরা সবসময় ফলাফলের দিক থেকে দারিদ্র্য পরিস্থিতি দেখি। যেমন আমরা বলি, ২১ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কিন্তু এর বাইরে আমি দারিদ্র্যকে সুযোগের দিক থেকেও দেখি যে এক্ষেত্রে বঞ্চনা আছে কিনা। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, শিক্ষার সুযোগ প্রান্তিক মানুষ সমভাবে পাচ্ছে কিনা, রাজধানীর ধনিক শ্রেণী যেভাবে স্বাস্থ্য সুবিধা পাচ্ছে বা দেশের বৃত্তবানরা যেভাবে স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পাচ্ছে, সেভাবে পুরো দেশের মানুষ কি পাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে বঞ্চনা আছে। সুতরাং আমার মনে হয় যে দারিদ্র্যকে বঞ্চনার দিক থেকেও দেখা দরকার এবং সুযোগের বঞ্চনাও দেখা দরকার। তার সঙ্গে ফলাফলের দিক থেকেও দেখা যাবে।
আপনার বক্তব্যে বিভিন্ন খাতের বঞ্চনার বিষয়টি এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে জানতে চাই সবচেয়ে কোন খাতে বঞ্চনার প্রবণতা বেশি।
বঞ্চনার ব্যাপ্তি, গভীরতা লক্ষ করলে দেখা যাবে আয় এবং কর্মনিয়োজনের ক্ষেত্রে বড় বঞ্চনা আছে। বর্তমানের তরুণ যারা শ্রমবাজারে ঢুকছে তারা তাদের ইচ্ছামতো বা পছন্দমতো কাজ পাচ্ছে না। আজকে যারা উচ্চশিক্ষিত তরুণ তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২২ শতাংশ এবং তিন লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণী তথা নারী কাজের জন্য খোঁজ করছে। অর্থাৎ কর্মনিয়োজনে বঞ্চনা আছে। কর্মক্ষেত্রে আয়ের দিক থেকেও একটা বিরাট বঞ্চনা আছে। সেই বঞ্চনা হলো অসমতা। অসমতাও এক ধরনের দারিদ্র্য এবং সেটাকে অনপেক্ষ নয় আপেক্ষিক দারিদ্র্য বলা হয়। এ হিসেবে আমি বলব যে কর্মনিয়োজনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য আছে। এছাড়া স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটা দারিদ্র্য আছে এবং এটি নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। বর্তমানে আমরা হামের প্রাদুর্ভাব ও হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যু দেখছি। শিশুদের আমরা হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি এবং গিয়ে দেখছি যে হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা কত কম। সুতরাং এ খাতগুলোয় আমার মনে হয় যে বঞ্চনার দারিদ্র্য অনেক বেশি।
একটা দেশের অনেকগুলো খাত একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। এ বিবেচনায় কোন খাত থেকে আমরা পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ শুরু করলে তা চক্রাকারে অন্য খাতগুলোর পরিস্থিতিও উন্নত করতে পারে?
যে খাত থেকে চক্রাকারে পরিস্থিতিকে ধীরে ধীরে ভালো দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেটি হলো শিক্ষা খাত। কারণ শিক্ষার বহুমাত্রিক সুফল আছে। শিক্ষা একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি মানুষের অংশগ্রহণের সক্ষমতাও বাড়ায়। আবার স্বাস্থ্য বিষয়ে কী করতে হবে, নাগরিক হিসেবে কীভাবে অংশ নিতে হবে, রাজনৈতিক অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে—এসবও শিক্ষা মানুষকে শেখায়।
আমার মতে, একটি জাতি তখনই ধ্বংসের দিকে যেতে শুরু করে যখন তার শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নামতে থাকে। কারণ শিক্ষার দুটি দিক আছে। একটি হচ্ছে পরিমাণগত দিক—কত শিক্ষার্থী ভর্তি হলো, কতজন পাস করল, কতজন বিদ্যালয় থেকে বের হলো। কিন্তু শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে গুণগত মান। আজকে বিশেষজ্ঞ না হলেও আপনি যদি রাস্তাঘাটে সাধারণ অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন, তারা সবাই বলবেন শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে।
আমার মনে হয়, শিক্ষার এ গুণগত অবনতির সঙ্গে মূল্যবোধের অবনতিও জড়িত। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম কিংবা পরে আমি যখন নব্বইয়ের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি, তখন কখনো শুনিনি যে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এখন যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন বুঝতে হবে শিক্ষার ভেতরে মূল্যবোধের সংকট তৈরি হয়েছে। আজ যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আছে, তারাই কয়েক বছর পর বৃহত্তর সমাজে যাবে। তারা যদি এ মূল্যবোধ নিয়েই সমাজে প্রবেশ করে, তাহলে সেই সমাজে সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও সন্ত্রাসই একসময় সংস্কৃতিতে পরিণত হবে।
সুতরাং শিক্ষার ক্ষেত্রে যে বঞ্চনা ও অবক্ষয় তৈরি হয়েছে, সেটি যদি আমরা দূর করতে পারি, মূল্যবোধকে যদি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে তার ইতিবাচক প্রভাব চক্রাকারে অন্যান্য খাতেও পড়বে।
শিক্ষার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারকে কী ধরনের সুপারিশ দেবেন, বিশেষ করে আসন্ন বাজেট ঘিরে?
শিক্ষার ক্ষেত্রে আমি মনে করি, দায়িত্বটা সবার। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ভাষায় বলতে গেলে—এ দায়ভাগে আমরা সবাই সমান অংশীদার। আপনি যেহেতু সরকার দিয়ে শুরু করেছেন, আমি সেখান থেকেই বলি।
প্রথম কথা হচ্ছে, শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে অর্থ লাগবে—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে মোট জাতীয় আয়ের খুব সামান্য অংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় হয়। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, অন্তত ৫ শতাংশের মতো বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না। রাষ্ট্রকে আগে ঠিক করতে হবে তার শিক্ষার দর্শন কী।
আমরা কি শুধু প্রতি বছর হাজার হাজার বা লাখ লাখ সনদধারী তৈরি করতে চাই? নাকি আমরা এমন মানুষ গড়ে তুলতে চাই, যারা শুধু শ্রমবাজারে ভূমিকা রাখবে না, বরং মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবেও সমাজকে কিছু দেবে? ব্যক্তিগত উন্নতি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু মানুষ যেহেতু সমাজে বাস করে, তাই সামাজিক দায়িত্ববোধও গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর আসে বৈষম্যের প্রশ্ন। ঢাকার কিছু অভিজাত বিদ্যালয়ে হয়তো একজন শিক্ষক ১০ শিক্ষার্থীকে পড়ান। কিন্তু শেরপুর বা নেত্রকোনার গ্রামের বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে ৫০-৬০ শিক্ষার্থী সামলাতে হয়। শহরের বিত্তবান বিদ্যালয়গুলো যে সুযোগ-সুবিধা পায়, গ্রামের বিদ্যালয়গুলো তা পায় না। তাই সরকারকে শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে পাঠ্যসূচি, পাঠক্রম, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। সম্প্রতি আমরা দেখলাম, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীরা পানির মধ্যে বসে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। শিক্ষকও চেয়ারের ওপর পা তুলে বসে আছেন। এটি কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতি হতে পারে না। প্রশাসন যদি আগে থেকেই জানে যে জলাবদ্ধতা বা বন্যা হতে পারে, তাহলে তার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা আগে নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ নিয়ে সেই তৎপরতা দেখা যায় না।
আমার মূল বক্তব্য হচ্ছে, শিক্ষাকে শুধু বই বা পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো, নিরাপত্তা—সবকিছুর উন্নয়ন প্রয়োজন। তবে আমি শুধু রাষ্ট্রের দায়ের কথা বলে শেষ করতে চাই না। এখানে সমাজেরও ভূমিকা আছে, অভিভাবকেরও ভূমিকা আছে, শিক্ষকেরও ভূমিকা আছে।
আজকে আমরা দেখি শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছেন, আবার এটাও সত্য যে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিজেও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেছেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার ব্যাপক রাজনীতিকীকরণ হয়েছে। ফলে শিক্ষকের নিরপেক্ষ ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আমি মনে করি, শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে অর্থায়ন, পাঠ্যক্রম, শিক্ষার পরিবেশ, অবকাঠামো, শিক্ষকের প্রশিক্ষণ, অভিভাবকের দায়িত্ব ও সামাজিক সচেতনতা—সব দিক একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু বাজেট বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
বিএনপি সরকার নির্বাচনের সময় তাদের ইশতাহারে বেশকিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেগুলো বাস্তবায়নে সরকার গঠনের পর পরই আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি দেখতে পাচ্ছি—যেমন খাল খনন, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড। এগুলোর লক্ষ্য কৃষকসহ সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নয়ন। এগুলো কতটা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করছেন?
সরকারের উদ্দেশ্য যে মহৎ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কৃষক কার্ড বা সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের নানা কর্মসূচি হয়েছে। বর্তমানে শতাধিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দেশে চালু আছে। এখন যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির কথা বলা হচ্ছে, সেটিও ব্যাপক আকারের একটি উদ্যোগ। বলা হচ্ছে, প্রায় পাঁচ কোটি মানুষকে এর আওতায় আনা হবে এবং এর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে।
আমি বিষয়টিকে দুটো দিক থেকে দেখি। প্রথমত, অর্থায়নের প্রশ্ন। এ ধরনের বড় কর্মসূচি একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতি—দুই জায়গাতেই এখন চাপ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, এ অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে? আমরা শুনেছি সরকার টাকা ছাপাতে চায় না। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত টাকা ছাপাতে হয়েছে এবং তার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে পড়েছে। এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
দ্বিতীয়ত, এ ধরনের কর্মসূচি ব্যাপকভাবে বাস্তবায়নের আগে পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত আকারে চালানো দরকার। যেমন এখন কয়েকটি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। আমি মনে করি, ছয় মাস বা এক বছর পর এটার মূল্যায়ন হওয়া উচিত—এটা কতটা কার্যকর হলো, যাদের জন্য করা হয়েছে, বিশেষ করে নারীদের কাছে সুবিধা পৌঁছেছে কিনা। কারণ অতীতে আমরা দেখেছি, নারীদের নামে সহায়তা গেলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই অর্থের নিয়ন্ত্রণ পুরুষের হাতে চলে গেছে। তখন মূল উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যায়।
যেহেতু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কথা এসেছে, আমরা দেখি বিভিন্ন ধরনের ভাতা রয়েছে। এসবের উদ্দেশ্যও নিশ্চয়ই মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করা। আপনি এক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি দেখছেন?
সামাজিক সুরক্ষার যে ভাতাগুলোর কথা বললেন, সেগুলোর আবার ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। কিছু ভাতা আছে, যেগুলো আজীবন দিতে হয়—যেমন প্রতিবন্ধী ভাতা বা বয়স্ক ভাতা। কারণ এগুলো শুধু দারিদ্র্য বিমোচনের বিষয় নয়, সমাজের দায়িত্বেরও বিষয়। সমাজকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হয়।
আবার কিছু ভাতা আছে, যেমন বেকার ভাতা, যেটা মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা। উদ্দেশ্য হচ্ছে, একজন মানুষ কাজ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে তাকে সহায়তা দেয়া। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, অনেক সময় এ ব্যবস্থাগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। বিভিন্ন প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে এসব ভাতার একটি রাজনৈতিক মাত্রাও আছে। কারণ সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ভূমিকা থাকে। আর সবসময় যে এ প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়েছে, তা নয়। বিভিন্ন মূল্যায়নে অপব্যবহারের চিত্রও উঠে এসেছে।
আমি মনে করি, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন হওয়া দরকার। শতাধিক ভাতা বা কর্মসূচি রাখা কতটা যৌক্তিক, সেটাও প্রশ্ন। এতগুলো কর্মসূচি পরিচালনা করতে যে প্রশাসনিক ব্যয় ও কাঠামো লাগে, সেটাও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। হয়তো এগুলোকে একীভূত করে আরো কার্যকর ও সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। ধরুন, একজন নারী একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড পাচ্ছেন, আবার বিধবা ভাতাও পাচ্ছেন, প্রতিবন্ধী ভাতাও পাচ্ছেন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—এসব কীভাবে সমন্বয় করা হবে? এ ধরনের বিষয়গুলো নিয়ে একটি সুসংহত নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন নিয়েও কিন্তু প্রায়ই বিতর্ক দেখা যায়। রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবের অভিযোগও থাকে। এক্ষেত্রে সরকার কীভাবে আরো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে বলে মনে করেন?
প্রথমেই সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে যে তারা এ কর্মসূচিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চায়। কারণ এটি শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেরও বিষয়। আপনি যেটা বললেন, সুবিধাভোগী নির্বাচনে অনিয়ম—এটা বাস্তব সমস্যা। কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড—সব ক্ষেত্রেই অনিয়ম ঢোকার ঝুঁকি আছে। কারণ কৃষকের মধ্যেও স্তরভেদ আছে—ভূমিহীন কৃষক আছেন, ক্ষুদ্র কৃষক আছেন, আবার বড় কৃষকও আছেন। সুতরাং কারা প্রকৃত সুবিধাভোগী, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
এটা খুব কঠিন কাজ, তা নয়। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সুনির্দিষ্টকরণ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও করা সম্ভব, যদি প্রশাসনের ওপর চাপ থাকে এবং নজরদারি নিশ্চিত করা যায়। দ্বিতীয়ত, পুরো প্রক্রিয়াটিকে যতটা সম্ভব সরল করতে হবে। যদি অতিরিক্ত সই, সত্যায়ন ও জটিল কাগজপত্রের ওপর নির্ভরশীল করা হয়, তাহলে দুর্নীতি ঢুকে পড়বে। তখন প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তারা নজরদারি করতে পারে যে প্রকৃতপক্ষে কী হচ্ছে। এছাড়া জবাবদিহিতা ও দৃশ্যমানতাও জরুরি। যেমন ভারতে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে উন্নয়ন ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ্যে টানিয়ে রাখা হয়—কোথায় কত খরচ হলো, কী কাজে লাগল। এতে সব দুর্নীতি বন্ধ না হলেও জনগণ অন্তত জানতে পারে অর্থ কোথায় যাচ্ছে। তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত হলে মানুষও প্রশ্ন তুলতে পারে।
এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক সংবাদ নয়, গ্রামাঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতিও সামনে আনতে হবে। একসময় মোনাজাতউদ্দিনের মতো সাংবাদিকরা গ্রামে ঘুরে মানুষের জীবন তুলে আনতেন। এখনো সে ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দরকার।
সবশেষে জানতে চাই, বাজেট ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকার এখন কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে মূল্যস্ফীতি কমানো ও জনজীবনে স্বস্তি ফেরানো যাবে?
আমরা এখন তিনটি ‘স’ এর মধ্যে আছি—সংকট, সংস্কার এবং সামাল দেয়া। সংকট আছে—এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। অনেকে বলছেন এখনই বড় ধরনের সংস্কার দরকার। কিন্তু আমার মনে হয়, এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে পরিস্থিতিকে সামাল দেয়া।
বিশ্ব পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট—এসবের প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়বে। আমদানি ব্যয় বাড়বে, রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থায় সরকারকে দ্রুত সংকট মোকাবেলা করতে হবে। যেমন সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের সময় দ্রুত তেল আমদানি ও পরিশোধনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল। ফলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এতে শুধু সংকট কমে না, জনগণের আস্থাও বাড়ে।
বাজেটের ক্ষেত্রেও আমি মনে করি, শুধু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নয়, তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবেলার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে এখন বড় সংকট রয়েছে। হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশুমৃত্যু আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কাঠামোগত সমস্যা আছে।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও শুধু মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক করলেই হবে না। বহুদিন ধরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন মুদ্রানীতি আরো সংকোচনমূলক করতে, কিন্তু তাতে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। এর মানে সমস্যার ভেতরে কাঠামোগত দিকও আছে। বাজারে কোথাও না কোথাও নিয়ন্ত্রণ বা সিন্ডিকেট কাজ করছে। আমরা দেখছি, রবিশস্যের মৌসুম শেষ হলেও সবজির দাম কমছে না, আমন উঠলেও চালের দাম কমছে না।
আমার মতে, বাজেটের তিনটি মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত করা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা যাবে না। কিন্তু যদি সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দ্রুত ফল দেখাতে পারে—বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমাতে পারে, তাহলে জনগণের আস্থা তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই আর্থিক খাত, বাণিজ্য খাতসহ বিভিন্ন জায়গায় সংস্কার দরকার। কিন্তু এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করা এবং মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেয়া।










