চব্বিশের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। দেশের বিভিন্ন স্থানে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, ধর্ষণ, নির্যাতন, খুন, অপহরণ, রাহাজানি ও কিশোর গ্যাং সাধারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এমনকি সম্প্রতি দেশের দুটি শীর্ষ গণমাধ্যমে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। চলতি বছর দিনদুপুরেও বিভিন্ন যানবাহনে ছিনতাই হয়েছে অভিনব কায়দায়। ছিনতাইকালে আগ্নেয়াস্ত্রসহ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছে ছিনতাইকারীরা। জানমাল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে। শারীরিক হামলা, ঘরবাড়ি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ, পাশাপাশি মূল্যবান সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকার ডেভিল হান্ট ও ডেভিল হান্ট ফেজ-টুসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত স্বস্তি আসেনি এবং সাধারণ মানুষের মনে বিরাজমান আতঙ্ক এখনো কাটেনি। অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চরম দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে ৪৭ দশমিক ১৭ শতাংশ মানুষ। এছাড়া দেশের ৩৩ দশমিক ৯১ শতাংশ মানুষ শারীরিক হামলার আশঙ্কায় থাকার কথা বলেছে। ঘরবাড়ি ও প্রতিষ্ঠানে হামলার শঙ্কার কথা জানিয়েছে ৪১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনকালীন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি আনা জরুরি। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শুধু ভোটার উপস্থিতিই বাড়বে না, বরং নির্বাচনের প্রতি আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে (বিদেশী বিনিয়োগসহ) নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দেশের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকারকে দ্রুত দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া উচিত।

অন্তর্বর্তী সরকার এখনো দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। শুরু থেকেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে জানমাল ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলেও বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সাধারণ মানুষ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে মূলত একটি বিষয়কে সামনে রেখে—অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কত দ্রুত ও কতটা কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিচ্ছে। অপরাধের পর যদি দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়, তবে মানুষের মধ্যে আস্থা জন্ম নেয়। বিপরীতে বিলম্ব, উদাসীনতা বা নিষ্ক্রিয়তা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। বর্তমান বাস্তবতায় সেই আস্থার ঘাটতিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

আইনের যথাযথ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা উচিত। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই রাজনৈতিক বিবেচনা বা পক্ষপাতিত্ব স্থান পেতে পারে না। বিচার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সামান্য রাজনৈতিক প্রভাবও জনগণের আস্থা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। পাশাপাশি পুলিশের মধ্যে যে ঢিলেঢালা মনোভাব ও সিদ্ধান্তহীনতা দেখা যাচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সক্রিয়, স্বাধীন ও পেশাদারভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও অপরাধ সংঘটিত হলেও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এটি পুরো আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। এ অবস্থার অবসান না ঘটলে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস আরো বিস্তৃত হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য এখনই দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করার পর থেকেই নির্বাচনী পরিবেশ ঘিরে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন ছিল নির্বাচনী নিরাপত্তা ঘিরে। এ প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হরহামেশাই বলে আসছেন যে নিরাপত্তাজনিত কোনো ঝুঁকি নেই। যদিও প্রকৃত চিত্র তার দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ক্রমেই বেড়েছে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। কেবল গত নভেম্বরে দেশে ৭২টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭২৪ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন নয়জন। রাজনৈতিক সহিংসতার তথ্য লক্ষ করলে আরো দেখা যায় অক্টোবরের তুলনায় এটি বেড়েছে। অক্টোবরে ৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৪৭ জন আহত ও দুজন নিহত হয়েছিলেন বলে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক সহিংসতাই নয়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল আচরণ ও ভূমিকা পালন করা উচিত। পুলিশ প্রশাসনকে দুষ্কৃতিকারীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের নানা ধরনের দায়িত্ব রয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে জোরদার অভিযান পরিচালনাও করা উচিত। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ার পেছনে কোনো অজুহাত থাকতে পারে না, থাকা উচিত নয়। প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে হবে। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনকে সাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে।