পুরনো বিষয়বস্তু মুখস্থবিদ্যায় ছেয়ে থাকা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের চাহিদা এবং অন্যান্য ব্যবস্থা ও দেশের শিশুদের সঙ্গে যে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে, তার জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত। পরবর্তী প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে, স্কুলগুলোকে অবশ্যই একটি সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান ও অভিযোজন ক্ষমতাকে উৎসাহিত করার সামগ্রিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
মুখস্থবিদ্যার বাইরে যাওয়া
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের স্কুল ও শিক্ষকরা অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার চেয়ে মুখস্থবিদ্যাকে বেশি উৎসাহিত করে আসছে। যদিও এটি পরীক্ষায় চমৎকার ফলাফল আনে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে বা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত করে না। সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান ও ডিজিটাল স্বাচ্ছন্দ্যের মতো মৌলিক দক্ষতাগুলো অবশ্যই অনুসন্ধানভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে শেখাতে হবে, যা কৌতূহল, স্বাধীন চিন্তা ও সমস্যা সমাধানে উৎসাহিত করে। বাংলা ভাষার সাবলীলতার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষার দক্ষতা বৈশ্বিক যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য। এর সঙ্গে কোডিং, ডেটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সাইবার নিরাপত্তাসহ ডিজিটাল সাক্ষরতার সূচনা শৈশবেই করতে হবে। এগুলো এখন পড়া ও লেখার মতোই মৌলিক।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গণিতের বাইরে
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, কিন্তু কলা ও মানবিক বিদ্যার বিনিময়ে নয়। একটি বিশ্বপ্রতিযোগিতামূলক শিক্ষা প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে সৃজনশীলতা, সহানুভূতি ও নৈতিক যুক্তিবোধের সমন্বয় ঘটায়। শিক্ষার্থীদের ধারণাগুলোকে কার্যকর ব্যবসায়িক সমাধানে রূপান্তর করতে উৎসাহিত করার জন্য ডিজাইন থিঙ্কিং, উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন বিষয়ে কোর্স চালু করা উচিত। একই সঙ্গে সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনের সংস্পর্শ শিশুদের আন্তঃসাংস্কৃতিক সচেতনতা এবং বিশ্ব নাগরিকত্ব বিকাশে সহায়তা করবে।
শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততা এবং সফট স্কিলের বিকাশ
বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই সফল হওয়ার জন্য তাদের মাঝে সফট স্কিলের বিকাশ অপরিহার্য। বিতর্ক, দলীয় প্রকল্প, নাটক বা খেলাধুলার মাধ্যমে যোগাযোগ, দলবদ্ধ কাজ ও আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে উৎসাহিত করে এমন অনুশীলনগুলো আত্মবিশ্বাস, সহানুভূতি ও নেতৃত্ব বিকাশে সহায়তা করে। একই সঙ্গে প্রাথমিক শ্রেণী থেকে অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা, স্বাধীন গবেষণা ও উদ্যোক্তা বিষয়ক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান ও বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করতে উৎসাহিত করবে। টেকসই শিক্ষা পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধকে আরো দৃঢ় করে এবং সততা ও সহনশীলতার মূল্যবোধ শিশুদের এমন এক বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তুত করে যেখানে আত্মবিশ্বাস ও অভিযোজন ক্ষমতা অতীব জরুরি। বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণের প্রেক্ষাপটে, বৈশ্বিক অনুশীলনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বিদ্যালয়গুলো সহনশীল ও সহযোগিতামূলক নাগরিক তৈরি করতে পারে যারা সমাজে অর্থপূর্ণ অবদান রাখবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগ্যতা গড়ে তুলবে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়ন
শিক্ষককে বাদ দিয়ে কোনো সংস্কারই সফল হতে পারে না। বাংলাদেশে এরা সর্বদাই প্রশাসনিক ও পাঠদানের অতিরিক্ত চাপে থাকেন, যার ফলে উদ্ভাবন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য খুব কম সময় পান। শিক্ষকদের অবশ্যই ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্বীকৃতি, কর্মজীবনে পদোন্নতি ও আর্থিক পুরস্কারের মতো প্রণোদনাগুলো গবেষণা, উদ্ভাবন ও শ্রেণীকক্ষে বৈশ্বিক দক্ষতার সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। একটি জাতীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল সরঞ্জাম, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও বৈশ্বিক শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করতে পারে।
অবকাঠামো ও সম্পদ
বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষার জন্য প্রয়োজন উৎকৃষ্ট অবকাঠামো। বিদ্যালয়গুলোকে অবশ্যই দ্রুতগতির ইন্টারনেট, আধুনিক গবেষণাগার, হাতেকলমে কাজ করার স্থান এবং আন্তর্জাতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগসহ গ্রন্থাগার দিয়ে সাজাতে হবে। সমতা নিশ্চিত করার জন্য ভিন্নভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সুবিধা অপরিহার্য। বিদ্যালয়গুলোকে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য অভিভাবক ও সম্প্রদায়ের জন্য উন্মুক্ত সামাজিক শিক্ষা কেন্দ্রে রূপান্তর করা যায়, যার মাধ্যমে শিক্ষা বৃহত্তর সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে অঙ্গীভূত হবে।
শিল্প সংযোগ
শিক্ষাকে কর্মজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে আগানো যাবে না। বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারত্ব শিশুদের প্রায়োগিক শিক্ষা ও উদ্ভাবনের সঙ্গে পরিচিত করতে পারে। শিক্ষামূলক ভ্রমণ, কারখানা পরিদর্শন, ইন্টার্নশিপ, পরামর্শদান কর্মসূচি এবং স্থানীয় উদ্যোগের সঙ্গে সহযোগিতা শ্রেণীকক্ষের জ্ঞান, বাস্তব প্রয়োগ ও উদীয়মান প্রযুক্তির মধ্যে ব্যবধান পূরণ করতে পারে। শিল্প খাত সমর্থিত উদ্ভায়ন গবেষণাগার উদ্যোগ নেয়াকে উৎসাহিত করতে পারে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প খাত ও সরকারের মধ্যে সহযোগিতার (ট্রিপল হেলিক্স) মাধ্যমে বিদ্যালয় পর্যায়েও প্রায়োগিক শিক্ষাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশকে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক বিনিময় কর্মসূচি, যৌথ প্রকল্প এবং অনলাইন সহযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রসারিত করতে হবে। শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষণ পদ্ধতির বৈশ্বিক মানের সঙ্গে পরিচিতি দিগন্ত প্রসারিত করবে এবং উচ্চ লক্ষ্য অর্জনে উৎসাহিত করবে। বিশ্বজুড়ে সেরা অনুশীলনের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করার জন্য বিদ্যালয়গুলোর উচিত দ্বিভাষিকতা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্বকে উৎসাহিত করা। বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈশ্বিক নিয়মাবলির সঙ্গে সংগতি নিশ্চিত করার জন্য গবেষণা ও শিক্ষার নৈতিক নির্দেশিকাও গ্রহণ করতে হবে।
পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন
সংস্কারের সঙ্গে জবাবদিহি থাকতে হবে। সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান, ডিজিটাল দক্ষতা ও সৃজনশীলতার জন্য জাতীয় মানদণ্ড স্থাপন করা উচিত। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নিয়মিত জরিপ সমস্যা চিহ্নিত করতে এবং নীতি পরিমার্জনের জন্য মতামত আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করবে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোর তুলনা করার জন্য তুলনামূলক সূচক ব্যবহার করে বিদ্যালয়ের কর্মক্ষমতা, গবেষণার সঙ্গে সমন্বয় ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক ফলাফলের ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে সংস্কারগুলো কেবল আকাঙ্ক্ষামূলক নয়, পরিমাপযোগ্যও।
বৈশ্বিক মডেল থেকে শিক্ষা
আমরা নানা দেশের উদাহরণ দেখতে পারি। বিশ্বজুড়ে স্কুলশিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের পরামর্শদান ও সম্মিলিত পরিকল্পনার মধ্যে তাদের সময়ের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করেন। বাংলাদেশ এটা অনুশীলন করলে শিক্ষার ফলাফল ও শিক্ষকদের সার্বিক কল্যাণ বাড়বে। এ ধরনের কাজের বণ্টন মডেল বাংলাদেশের স্কুলগুলোকে সময়সূচি পুনর্গঠন করতে এবং প্রশিক্ষণ, উদ্ভাবন ও সম্পদ উন্নয়নের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও জাপানের মতো দেশগুলো সফলভাবে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় সহযোগিতামূলক শিক্ষা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা এবং সামাজিক-আবেগিক পাঠ্যক্রমকে একীভূত করেছে, যা শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানের পাশাপাশি সহনশীলতা, সহানুভূতি ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করে। এ অনুশীলনগুলো স্থানীয় প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্কুলগুলো কেবল মুখস্থবিদ্যার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে এবং আধুনিক সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সুপ্রস্তুত থাকা সর্বাঙ্গীণ শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের শিশুদের জাতীয়ভাবে সমৃদ্ধি লাভের পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সফল হওয়ার জন্যও প্রস্তুত করতে হবে। এর জন্য স্কুলশিক্ষার একটি সামগ্রিক, নীতি-নির্দেশিত রূপান্তর প্রয়োজন, যার মধ্যে থাকবে STEAM শিক্ষার একীভূতকরণ, অবকাঠামোয় বিনিয়োগ, শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন, স্কুলগুলোকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। শিক্ষা ব্যবস্থায় কৌতূহল, সৃজনশীলতা, সহনশীলতা ও বৈশ্বিক নাগরিকত্বকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার পরবর্তী প্রজন্মকে একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তুত করতে পারে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি মুখস্থবিদ্যা চালিয়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি নেব, না সংস্কারকে গ্রহণ করে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের বৈশ্বিক মঞ্চে প্রতিযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত করব। দেশের কর্ণধাররা শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে পারেন, তবে তা শিক্ষাকে গতানুগতিক সেবা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে দেখে।
মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান: অধ্যাপক
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি










