আনোয়ার সিকদার, কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সাবেক চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সাবেক চেয়ারম্যান। এছাড়া বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি কৃষি, শিক্ষা, জ্বালানি, আমলাতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম

আপনি একজন কৃষিবিদ ও কৃষিবিদদের সংগঠনের প্রতিনিধিও। তরুণরা কৃষিতে যেতে অনাগ্রহী। এমনকি যারা কৃষি বিষয়ে পড়ছে তারাও এ খাতে যাচ্ছে না। অথচ একসময় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিল। কৃষিতে উৎপাদন বাড়ছে। কৃষি কিন্তু জনপ্রিয় না। কৃষির এ বেহাল দশার পেছনে কারণটা কী?

কৃষি আমাদের মূল আদিম পেশা। অন্য পেশাগুলো অনেক বৈচিত্র্যময়, দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব, দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও মুনাফা বৃদ্ধি সম্ভব। কৃষিতে ইচ্ছা করলেই একটি জমিতে যে বছর ১০ মণ ধান উৎপাদন হয়েছে সেটি পরের বছর ৩০ মণ উৎপাদন করা যাবে না। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি প্রক্রিয়ায় একপর্যায়ে প্রান্তিক বৃদ্ধি ক্রমহ্রাসমান। কিন্তু অন্য খাতে এটি নেই। কৃষি বাদে অন্য খাতে সঠিক কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারলে কয়েক গুণ বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু কৃষিতে এটি সম্ভব নয়।

কৃষিতে উৎপাদিত দ্রব্য হচ্ছে প্রাথমিক উৎপাদন। অন্ন, বস্ত্র থেকে শুরু করে সবকিছুই প্রাথমিকভাবে কৃষি থেকেই উৎপাদন হয়। সুতরাং খাদ্য উৎপাদনে কৃষির বিকল্প নেই। কৃষি পেশাকে সেভাবে মূল্যায়িত করা হচ্ছে না, সম্মানিত করা হচ্ছে না। ‘‌বিনোদন কৃষি’র ধারণা আমাদের দেশে নেই। ‘‌পর্যটন কৃষি’র ধারণাও আমাদের দেশে নেই। কৃষি যদি লাভজনক না হয় তাহলে কেউই কৃষিতে আগ্রহী হবেন না, আনন্দ পাবেন না।

তবে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদানের হার তুলনামূলক কমে গেলেও কিংবা কৃষি ক্ষেত্রে সরাসরি জড়িত লোকের হার কমলেও সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশে চালের উৎপাদন ১৯৭০ সালের ১০৮ লাখ টন থেকে বর্তমানে ৪০০ লাখ টনে পৌঁছেছে। সেদিক থেকে কৃষির একেবারে বেহাল অবস্থা নয়।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

কৃষি পেশা লাভজনক করতে হবে। আবার শুধু লাভজনক হলেই কৃষিকাজে আগ্রহী হবেন না। তার সঙ্গে কৃষিকাজ সহজ, আনন্দময়, সম্মানের হতে হবে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে, ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে। কৃষি ও কৃষকদের সঙ্গে বিনোদন কর্মকাণ্ডের, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সংযোগ ঘটাতে হবে। এর অবর্তমানে কৃষি তুলনামূলকভাবে বিশেষ করে তরুণদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে না।

কৃষির প্রতি কৃষকের আগ্রহ বাড়াতে হলে কৃষিতে বিভাগ, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে কৃষি পুরস্কার চালু করা যেতে পারে। যারা কৃষি উৎপাদনে ভালো অবদান রাখছে তাদের স্বীকৃতির ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকায় এনে কয়েকজন কৃষককে পুরস্কার দেয়া হচ্ছে, সেটি পর্যাপ্ত নয়। আগ্রহী ও সফল কৃষকদের দেশে এমনকি বিদেশে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য সফরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া জেলায়-উপজেলায় তরুণদের জন্য কৃষি ক্লাব করা যেতে পারে, সেখানে তারা কৃষি সম্পর্কে জানতে পারবে, অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারবে, কৃষিভিত্তিক সাংস্কৃতিক কমকাণ্ড হবে, ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। বিনোদন কৃষি, পর্যটন কৃষির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কৃষকরা আনন্দ পাবেন। আরো একটি কথা, কৃষি পেশাজীবীরা আর্থিকভাবে, সামাজিকভাবে, চাকরি ক্ষেত্রে পদোন্নতিতে বৈষম্যের শিকার বলেই তরুণরা এ খাতে থাকছেন না।

কৃষির সঙ্গে শিল্পের সম্পর্কটা কেমন? এটা কি আরো বাড়ানো যায়?

অর্থনীতির ভাষায় একটি অর্থনীতি বা দেশ তখনই দ্রুত উন্নত হবে, যখন দ্রুত শিল্পায়ন হয়। আর দ্রুত শিল্পায়ন নির্ভর করে উন্নত কৃষির ওপর। তা না হলে সম্ভব নয়। শিল্পের জন্য দেশের বাইরে থেকে কাঁচামাল আমদানি করা যেতে পারে। কিন্তু যে দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করা হবে, তারাও কাঁচামাল কৃষি থেকেই উৎপাদন করছে। অর্থাৎ আমাদের কৃষিতে যেতেই হচ্ছে। তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল আমরা বিদেশ থেকে আমদানি করি। কিন্তু যদি আমরা কাঁচামাল উৎপাদন করতে পারতাম তাহলে প্রফিট মার্জিন আরো ভালো হতো, ভ্যালু এডিশন বেড়ে যেত। আমাদের রফতানি আয়ের শতকরা ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। কিন্তু আমাদের কী পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করতে হয় সেটা কিন্তু বলি না। আমদানি বাবদ প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ তৈরি পোশাক রফতানি আয়ের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়।

গড় উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কৃষিতে আবাদি জমি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। শিল্পায়ন ও নগরায়ণের কারণে কৃষিজমি কমবেই। গ্রামে অনেকেই এখন ফসলি জমিতে পাকা ঘর তুলছে। বিশেষ করে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থে যেখানে-সেখানে আবাদি জমিতে ঘরবাড়ি তৈরি করা হচ্ছে। এতে আবাদি জমি দ্রুত কমছে। একই পরিবারের পাঁচজন পাঁচটি জমিতে ঘরবাড়ি না তুলে একটি জমিতে বহুতল ভবন তুলতে পারে। পুরো দেশে কৃষিজমি রক্ষা করার জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার। অতি সম্প্রতি স্থানিক পরিকল্পনা (Spacial Planning) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি হয়েছে যার দ্রুত বাস্তবায়নকল্পে মহাপরিকল্পনা করা আশু দরকার।

আপনি টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান ছিলেন। এলএনজিসহ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ চলে যায়। দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুৎ (গ্রিড-অব গ্রিড) পাই। আমরা কীভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি?

জ্বালানি খাতে সুশাসন দরকার। এক সময় প্রয়োজন ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর। কিন্তু এখন সেই সংকট অনেক কমে গেছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩২ হাজার মেগাওয়াট। এখন মানসম্মত এবং পরিবেশসম্মত বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই, বিশ্বের অনেক দেশ প্রায় শতভাগ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পেতে হলে আমাদের অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে, অনেক বিনিয়োগ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে আমরা কখনই আন্তরিক ছিলাম না। আমাদের স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর স্রেডা হয়েছে। অথচ এটি স্বাধীনতার পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে হওয়া উচিত ছিল। তবে স্রেডা খুব স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারছে বলে মনে হয় না। আমি মনে করি, স্রেডাকে আরো শক্তিশালী করা উচিত। এর লোকবল, প্রশাসনিক ও কারিগরি সক্ষমতা এবং কাজের পরিধি বাড়ানো উচিত।

সোলার এবং বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। জলবিদ্যুতে ২৩০ মেগাওয়াটের পর আরো বেশি কিছু আশা করা যায় না। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টাও সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছেন। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। শুধু ছাদই নয়, আরো অনেক বিকল্প আছে। চর, বন, পাহাড় এলাকা, নৌযান, ফিলিং স্টেশন কিংবা পানির ওপর সোলার স্থাপন করা যায়। সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিকভাবে বিনিয়োগ বেশি। তবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় একেবারে খুবই কম বা নেই। আমাদের বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনাও আছে। কিন্তু আমরা খুব বেশি এগোতে পারিনি। গবেষণা হচ্ছে দেশের কোন কোন এলাকায় লাভজনকভাবে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তা নিয়ে। সেটা ধরে দ্রুত অগ্রসর হওয়া দরকার। ভবিষ্যতে আমাদের কনভেনশনাল এনার্জি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে না। একসময় হয়তো আমাদের ওপরে বৈশ্বিক চাপও আসবে, কয়লাভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার করা যাবে না। গ্যাসের রিজার্ভও কমে আসছে, অবশিষ্ট মজুদ মাত্র ৮ টিসিএফ। সবকিছু মিলিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

সমাজ প্রেক্ষাপটে দেশের শিক্ষা কাঠামোটা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

শিক্ষা ব্যবস্থায় সামাজিকভাবে বেশ বড় একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়ার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, শিক্ষাকে চাকরি বা উপার্জনের বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মাধ্যম করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মানুষ রূপে গড়ে তুলতে না পারলে উপার্জনের পথও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব না। শিক্ষার মাধ্যমে শিশুর মানসিক বিকাশের দিকে কেউ গুরুত্ব দিচ্ছি না। এজন্য অভিভাবক ও শিক্ষকদের অধিকাংশের বড় দায় রয়েছে।

বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে মূল্যবোধের বড় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এক সময় শিক্ষকরা আমাদের দিকে তাকালে এমনকি কঠোর শাসন করলেও মনে হতো যেন স্নেহবর্ষিত হচ্ছে আমাদের প্রতি। তাদের দায়িত্বশীলতা ছিল প্রশ্নাতীত। তারা চাইতেন আমরা যেন পড়াশোনা করে মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হতে পারি। কিন্তু সেই জায়গা থেকে আমরা অনেক দূরে চলে গেছি। মূল্যবোধের ঘাটতি এবং শিক্ষার অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় সতর্কবার্তা।

মূল্যবোধসম্পন্ন আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক পরিবেশ সংরক্ষণের দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রের। একটা উদাহরণ দিই। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে একবার একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল যে শিশুদের জন্য ‘সোশ্যাল পলিসি ফর চিলড্রেন’ প্রণয়ন করা হবে। এর উদ্দেশ্য হবে শিশুদের সামাজিকভাবে কীভাবে ভালো একটা পরিবেশ দেয়া যায়। সে সময় একজন আমাকে বলছিলেন যে আমরা যদি আদর্শ পরিস্থিতিতে একটা শিশুকে বড় করতে পারি তাহলে সে গালি দেয়া, অন্যায় করা, মিথ্যা বলা শিখবে না আর এ পলিসিও করা লাগবে না। এটা বাস্তব। বাংলাদেশে জন্ম এ ধরনের শিশুরা বিদেশে লালিত পালিত হলে তারাও কিন্তু মিথ্যা বলা, গালি দেয়া, চুরি করা—এসব শেখে না। কিন্তু আমরা শিশুদের সে পরিবেশ দিতে পারিনি, পারছিও না। শিক্ষার অংশীজনরা এভাবে চিন্তা করছে না। ফলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ, বড়দের সম্মান জানানো এগুলো শেখানো হচ্ছে না।

আমাদের পেশাদার ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?

আমি মনে করি, সরকারের আইন-কানুন বিধিবিধান যথেষ্ট আছে সেগুলো যদি আমরা মেনে চলি, তাহলে এখন জনগণকে যে সার্ভিস দিচ্ছি তার দশ গুণ সেবা দেয়া সম্ভব। সমস্যা হলো বাস্তবায়ন নেই। একটি দায়িত্ব রাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীকে কতটুকু সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে তা বিধিবিধানে বিস্তারিত বলা আছে। আইন-কানুনে ঘাটতি না থাকলেও বাস্তবায়নে ঘাটতি আছে। যেমন ধরুন, সততা, মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশিক্ষণ ও সন্তোষজনক চাকরির ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারীদের পদোন্নতি হওয়ার কথা বলা আছে ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৮ ধারায়। কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বরং রাজনৈতিক পরিচয়, নেটওয়ার্কিং ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পদোন্নতি হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক।

আইন-কানুন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুশাসন। সুশাসন আপনা-আপনি আসবে না। যেহেতু প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চলেছে, তাই সেখানে সুশাসন ফেরানো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সবারই ঐকান্তিক চেষ্টা থাকতে হবে। এজন্য প্রাথমিক প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞা। রাজনৈতিক সরকার যদি কঠোর হয় বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় তাহলে সুশাসন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে সে সঙ্গে অবশ্যই বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ও শক্ত হাতে পরিচালনা করা না হলে সুশাসন ফিরিয়ে আনা খুব কষ্টকর।

জনপ্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে সম্প্রতি বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার

মতামত কী?

সরকারি চাকরি আইন ২০১৮-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী অবসরে যাওয়ার পর সরকার অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি জনস্বার্থে যেকোনো কর্মচারীকে সরকারি চাকরিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে বলা দরকার, নানাবিধ কারণে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেয়া উচিত বা কেবল কারিগরি জ্ঞান, দক্ষতা-সংক্রান্ত পদে কোনো কর্মকর্তার বিকল্প পাওয়া না গেলে তখনই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।

একান্ত প্রয়োজনে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে আহবায়ক করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব, পিএসসির চেয়ারম্যান, সিএজি, পদসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিবকে (সদস্য সচিব) নিয়ে ‘‌চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুপারিশ কমিটি’ গঠন করা যেতে পারে। যথাসময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে পদ/পদগুলো শূন্য হওয়ার ন্যূনতম এক মাস আগে কমিটি কার্যক্রম শুরু করবে। কমিটি প্রাপ্ত আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন করে প্রতিটি পদের বিপরীতে দুজনের নাম প্রস্তাব করবে, যেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে একজনকে নিয়োগ দেয়া হবে।

আপনি দীর্ঘদিন প্রশিক্ষণের সঙ্গে জড়িত। একজন প্রশিক্ষক হিসেবে আপনি কী মনে করেন আমাদের দেশের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন কর্মকর্তা তৈরিতে সহায়ক?

এ দেশের প্রশিক্ষণ খাত, বিশেষ করে অসামরিক প্রশিক্ষণ খাত দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রীয়ভাবে, সামাজিকভাবে ভীষণভাবে অবহেলিত। মুখে মুখে বা কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণের গুরুত্বের কথা উচ্চারিত হলেও বাস্তবে দৈন্যদশা অবর্ণনীয়। বৈদেশিক প্রশিক্ষণে বা বৈদেশিক শিক্ষাসফরে কর্মকর্তাদের আগ্রহ অপরিসীম, কিন্তু স্থানীয় প্রশিক্ষণে অনাগ্রহ। সরকারি বা বেসরকারি উভয় সেক্টরে আর্থিক দৈন্যদশা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, পদায়িত কর্মকর্তাদের সম্মান ও সামাজিক স্বীকৃতির অভাব, সরকারি আনুকূল্যের অপর্যাপ্ততা এ খাতকে দুর্বল করে রেখেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও প্রশিক্ষণ-সংক্রান্ত কোনো আইন নেই। ২০২৩ সালে জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা নীতি জারি হলেও দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের জন্য জাতীয় প্রশিক্ষণ নীতি অদ্যাবধি প্রণীত হয়নি।

প্রশিক্ষণ খাতে সুশাসন আনতে হলে টেকসই উন্নয়ন সাধনের জন্য এটি জরুরি প্রণয়ন করা দরকার। এছাড়াও প্রশিক্ষণ খাতের মনিটরিংও মূল্যায়ন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং পলিসি সহায়তা প্রদানসহ সার্বিক সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘‌মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কর্মজীবন পরিকল্পনা’ নামে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। আশার কথা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের নবম সভায় প্রধান উপদেষ্টা জনপ্রশাসনের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃজনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন করে র‍্যাংকিং করার নির্দেশ দিয়েছেন।

অনেকেই বলেন টেকসই সমাজ উন্নয়নে সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে আপনার মূল্যায়ন কী?

দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু সমাজের মানুষের মানসিকতা, রীতিনীতি, আদর্শ, আচার-আচরণ সংস্কারের চেষ্টা কম। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা, গবেষণা, নীতিনির্ধারণ একেবারেই অনুপস্থিত। দীর্ঘদিন ধরেই সুকুমার বৃত্তির চর্চা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা বা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল স্তিমিত হতে দেখা যাচ্ছে। কারো কাছে ইতিবাচক কিছু প্রত্যাশা করলে অবশ্যই তার সুকুমার বৃত্তি জাগিয়ে তুলতে হবে, লালন করতে হবে। এটা না করতে পারলে মানুষকে তার কু-প্রবৃত্তি কাবু করে ফেলে। আর বর্তমানে এ প্রবণতাই বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। সাংস্কৃতিক অঙ্গন দুর্বল হয়ে পড়েছে। সুকুমার বৃত্তিচর্চা, মূল্যবোধের চর্চা, নৈতিক সৃজনশীল শিক্ষা, সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ, সুস্থ স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার মাত্রা কমে যাচ্ছে। যে কারণে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে, সহিংসতা বেড়েছে, অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। বেড়েছে চাওয়া পাওয়া, ব্যক্তিস্বার্থ, দাবি-দাওয়া আর তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ।

দেশের প্রতি মানুষের যে মমত্ববোধ তা মনে হয় অনেক ক্ষেত্রেই ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। দেশের ভবিষ্যৎ উপেক্ষা করে অনেকেই সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বা চলে যেতে উৎসাহিত করছেন। অথচ তাদেরই এক সময় দেশের হাল ধরার কথা, দেশ পুনর্নির্মাণ করার কথা। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। নিজকে নিয়েই ব্যস্ত। সবাই পালিয়ে গেলে দেশটা সামলাবে কে, গড়বে কে? এটা চিন্তা করি না। খুবই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। হতাশাজনক।

২০২৫ সালের শেষ দিকে চলে এসেছি। নতুন বছরের প্রত্যাশা কী?

নতুন বছরে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করি। বিগত সময়ের ভুলভ্রান্তি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সবার আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিধি বৃদ্ধি পায়। আগামী দিনে সে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটলে হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এখন সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একদা আমাদের সমজাতীয় অনেক দেশ অনেক ওপরে উঠে গেছে। গত ৫৪ বছরে আমাদের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত কমবেশি উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আমাদের মানসিক/মানবিক উন্নতি সেভাবে হয়নি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ কাঠামো গড়ে ওঠেনি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আশা করি, একদিন আমাদেরও তা হবে। কিন্তু সেজন্য সুশাসন আনতে হবে। গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সরকারের বিকল্প নেই। সুশাসনের জন্য সর্বাগ্রে রাজনৈতিক অঙ্গীকার দরকার।