আন্দোলনটিকে বাস্তব রূপ দেয়ার কাজ শুরু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই দেশটির বিভিন্ন গ্রাম থেকে উচ্চমূল্য সংযোজনের ৩০০ পণ্য চিহ্নিত করা হয়। ফলে জাপানের অনেক পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি দেশটির গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এমন অভিনব ধারণা শিগগিরই কিরগিজস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, কম্বোডিয়া, কোরিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকও ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রডাক্ট’ (ওভিওপি) নামে এক উচ্চাভিলাষী জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এজন্য প্রকল্পের প্রাথমিক রূপরেখা প্রণয়ন বিষয়ে একটি আলোচনা সভাও হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন, দেশীয় পরিসরে উৎপাদিত স্থানীয় পণ্য ব্যবহারে রফতানি বৈচিত্র্য আনা এবং এক কোটিরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্য এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশের নাজুক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় স্থানীয় অপ্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রচলিত পণ্যকে আনুষ্ঠানিক করার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে উদ্যোগটি যেন নানা কারণে ব্যর্থ না হয় এবং জাপানের মতোই কৃষি বিপ্লবের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে সে বাস্তবতা বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কৌশলগতভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।
দেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। তবে এ প্রবৃদ্ধি উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরিতে আনুপাতিক ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রতি বছর শ্রমবাজারে নতুন করে ২০ লাখ মানুষ যুক্ত হলেও ৮৪ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। এদিকে দেশের আমদানি-রফতানি দুই খাতেই মন্দাবস্থা বিরাজ করছে। বৈদেশিক বিনিয়োগও আশানুরূপ নয়। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রফতানিমুখী করার জন্য দেশী বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে উৎসাহ বাড়ানো জরুরি। কিন্তু বর্তমানে দেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এ একমুখী নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এমন সময়ে ওভিওপি প্রকল্পের গ্রামীণ ও অনানুষ্ঠানিক খাতের পণ্যগুলোকে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের অধীনে এনে বিশ্ববাজারে ভোক্তাদের সামনে উপস্থাপন করার উদ্যোগ রফতানি আয়বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে। সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী অনেক পণ্য পাওয়া যাবে। অর্থায়ন, অবকাঠামো এবং বাজার যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় এসব পণ্য আন্তর্জাতিক বা জাতীয় কোনো পর্যায়েই পৌঁছতে পারে না। ওভিওপি এ কাঠামোগত সমস্যা দূর করতে পারে। কিন্তু কাগজে ভালো পরিকল্পনা এবং মাঠে কার্যকর বাস্তবায়ন—এ দুইয়ের মধ্যকার দূরত্ব অতিক্রম করাই প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ওভিওপি পরিকল্পনাকারীদের এ উপলব্ধি সঠিক যে এ ধরনের উদ্যোগের বৈশ্বিক মডেলগুলো দেশীয় বাস্তবতায় হুবহু অনুসরণ করা সম্ভব নয়। জাপানের মডেল সম্প্রদায়গত মালিকানায় শক্তিশালী হলেও বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগযোগ্য নয়। থাইল্যান্ডের মডেল জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর হলেও অতি সরকারনির্ভর। ভিয়েতনামের মডেল মানসম্পন্ন পণ্য সনদ তৈরিতে দক্ষ হলেও প্রশাসনিকভাবে ভারী। ইন্দোনেশিয়ার ক্লাস্টার পদ্ধতি শিল্পায়নে কার্যকর হলেও অর্থায়ন দুর্বলতায় ভুগছে। বাংলাদেশের ওভিওপির বিশেষত্ব হলো এটি বিশাল বিশাল অনানুষ্ঠানিক গ্রামীণ অর্থনীতি, জামানতভিত্তিক ঋণের সীমাবদ্ধতা, রফতানিতে পোশাক শিল্পের একচেটিয়া আধিপত্য এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বাস্তুসংস্থানের বিষয়গুলো বিবেচনা করে পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করেছে। ওভিওপির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ক্লাস্টার মডেল সরাসরি উৎপাদকদের সংগঠিত করার মাধ্যমে পণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেজিংয়ে যুক্ত করে এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। ফলে উৎপাদনকারীর আয়বৃদ্ধির পাশাপাশি তাকে ঘিরে সহায়ক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়। প্রকল্পের আরেকটি বিশেষত্ব অনানুষ্ঠানিক শ্রম খাতে যুক্ত নারীদের অংশগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা ও রফতানি দক্ষতা বৃদ্ধির তিন-স্তরীয় প্রশিক্ষণ কাঠামোও কর্মসংস্থান বাড়াতে দূরদর্শী পদক্ষেপ।
তবে এ প্রকল্পের সামনে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। ওভিওপির পাঁচ স্তরের তত্ত্বাবধান কাঠামোতে আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, এসএমই ফাউন্ডেশন, পিকেএসএফ এবং বেসরকারি খাত। দেশের প্রশাসনিক বাস্তবতায় এতগুলো সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ঐতিহাসিকভাবে কঠিন। আন্তঃমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্ব, দায়িত্বের অস্পষ্টতা এবং বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন অগ্রাধিকার প্রকল্পের কারণে এ প্রকল্পের গতি শ্লথ হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। তাছাড়া সারা দেশে ৬৮ হাজার গ্রামে ছড়িয়ে থাকা উৎপাদকদের একক পণ্যের ভিত্তিতে ক্লাস্টারে সংগঠিত করার লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও বিশাল। পণ্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাজারচাহিদাকে ঐতিহ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়ার নির্দেশনা থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক চাপ ও আঞ্চলিক স্বার্থ এ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে বাজারে যে পণ্যের চাহিদা নেই, সেই পণ্যও ক্লাস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে দেশীয় বাজারে সুপারশপ ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে হলে পণ্যের মান, প্যাকেজিং ও সরবরাহ ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। আর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মান সনদ, ফাইটোস্যানিটারি সার্টিফিকেট এবং দক্ষ রফতানি সহায়তা অবকাঠামো। বাস্তবতা হলো, দেশের কৃষি ও হস্তশিল্প পণ্যের ক্ষেত্রে এসব সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া এখনো দীর্ঘ ও জটিল। এ সংকটও প্রকল্পটির জন্য একটি জটিলতা হতে পারে।
প্রকল্পে ৫২টি ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকগুলোর শাখা বা এজেন্ট উপস্থিতি সীমিত। ভ্যালু চেইনভিত্তিক অর্থায়নের ধারণাও দেশের অধিকাংশ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন। যেহেতু ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অনেক ব্যাংকের নেই তাই খেলাপি ঋণের ঝুঁকি মাথায় রেখে ব্যাংকগুলোর মধ্যে অনীহা দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি প্রযুক্তিগত। ওভিওপি মডেলটিকে ‘ডিজিটাল ফার্স্ট’ বলা হচ্ছে। এ মডেলে প্রতিটি উৎপাদকের ডিজিটাল আইডি, কিউআর কোডের মাধ্যমে চিহ্নিত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ক্রেডিট স্কোর নির্ধারণ করার সুবিধা থাকবে। এ ধরনের সুবিধার জন্য নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট কাভারেজের পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা অনেক জরুরি। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট কাভারেজ অসম এবং বয়স্ক কৃষক ও কারিগরদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার অনেক কম। এ ব্যবধান কমানোর বিকল্প খুঁজে না পেলে ডিজিটাল প্লাটফর্মটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। \
অতএব, ওভিওপি প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একার পক্ষে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রশাসনিক সমন্বয় এক্ষেত্রে অপরিহার্য। বিশেষত আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন জটিলতা নিরসন ও প্রযুক্তি অবকাঠামো শক্তিশালী করার জন্য প্রাথমিক পর্যায়েই কৌশলপত্র নিতে হবে। ক্লাস্টার মডেল কার্যকর করতে কোল্ড স্টোরেজ, সড়ক অবকাঠামো, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাঁচামাল সহজলভ্যকরণ এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবা সম্প্রসারণে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ওভিওপি পণ্য উৎপাদক ও রফতানিকারকদের জন্য বিশেষ করছাড়, শুল্ক সুবিধা এবং বীমা সুরক্ষা দেয়ার কথাও ভাবতে হবে। টিসিবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ইত্যাদি সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওভিওপি পণ্য কেনার ব্যবস্থা করলে প্রাথমিক পর্যায়ে নিশ্চিত বাজার তৈরি হবে। এমনকি ওভিওপি পণ্যকে বৈদেশিক বাজারে জনপ্রিয় করার জন্য বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোকে প্রচারক হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। এমনকি আন্তর্জাতিক মেলাগুলোতেও অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য কাজ করতে হবে।
দেশে হস্তশিল্প, কৃষিজ পণ্য ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং ও ই-কমার্সের দ্রুত বিকাশ ডিজিটাল প্লাটফর্মের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে প্রকল্পের সাফল্য নিশ্চিত করতে কিছু মূলনীতি মেনে চলা জরুরি। শুরুতে পাইলট পর্যায়ে মাত্র কয়েকটি জেলায় সীমিতসংখ্যক পণ্য নিয়ে শুরু করা যেতে পারে। সেখান থেকে পর্যবেক্ষণ তথ্য নিয়ে প্রকল্পটিকে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। পণ্য নির্বাচনে বাজারচাহিদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া দরকার। ঐতিহ্যবাহী হলেই তা গুরুত্ব পাবে এমনটি নয়। এছাড়া বেসরকারি এগ্রিগেটর প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু গ্রামীণ সরবরাহ শৃঙ্খলে কাজ করছে, তাই এগুলোর অভিজ্ঞতা লাগাতে পারলে প্রকল্পের গতি বাড়বে। ওভিওপি সাধারণ ঋণ কর্মসূচি নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিও। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, ব্যাংক খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ, ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছ বাস্তবায়ন—এ চার শর্ত পূরণ করার কৌশল নিতে পারলে প্রকল্পটি সফল হবে।










