দীর্ঘ বিরতির পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যাশা ছিল ছাত্র প্রতিনিধিদের হাত ধরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার পরিবেশের মানোন্নয়ন ঘটবে। তারা শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তোলায় মনোযোগী হবেন। কিন্তু বাস্তবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ড এমন দাঁড়িয়েছে, যা শিক্ষার পরিবেশ ক্রম অবনমনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তথা কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচন হওয়া প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক চিত্র সে কথাই বলছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ঘিরে অভিযোগের ধরনও কমবেশি এক। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্বাচিতদের দায়িত্বের সীমা অতিক্রম করে প্রশাসনিক বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রকৃত যে উদ্দেশ্য তা তাদের কার্যক্রমে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

প্রতিটি ছাত্র সংসদের নির্দিষ্ট গঠনতন্ত্র রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্বও। তাদের প্রধানতম কাজ হলো শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করে এমন যেকোনো সমস্যার সমাধানে তৎপর থাকা। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলো শনাক্ত করা ও সমাধানের ব্যবস্থা নেয়া। একাডেমিক উৎকর্ষের জন্য কাজ করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও খেলাধুলার আয়োজন করা। আবার শিক্ষার্থীরা কীভাবে স্কলারশিপ পেতে পারে, বিশেষ করে আর্থিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীরা তা নিয়ে কাজ করাও প্রতিনিধিদের কাজ। এর বাইরে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করে এমন কাজের বিরুদ্ধে সচেতন অবস্থানে থাকা, তা প্রতিহত করতে তৎপর থাকাও তাদের কাজের অংশ। আবার শিক্ষা সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়েও তারা কাজ করতে পারে। ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মতো উন্নত দেশগুলোতে ছাত্র সংসদ শিক্ষানীতি, সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়েও সক্রিয় থাকে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট ইউনিয়ন, হার্ভার্ড আন্ডার গ্র্যাজুয়েট কাউন্সিলসহ বিভিন্ন উন্নত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলো শিক্ষানীতি, টিউশন ফি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজনসহ নানা কাজে সক্রিয় থাকে। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ কীভাবে শিক্ষার্থীবান্ধব হবে তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব ছাত্র সংসদের কাজের অংশ। তবে এসব কাজ করারও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে।

ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সহযোগী হিসেবেও কাজ করেন। তবে প্রশাসনিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত কাজ ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা করতে পারেন না। এমন কাজের ক্ষেত্রে তারা প্রশাসনকে নিয়ম মেনে অবগত করতে পারেন। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা প্রশাসনিক কাজ করার এখতিয়ার রাখেন না। কিন্তু বর্তমানের ছাত্র সংসদ প্রতিনিধিদের কেউ কেউ এখতিয়ারবহির্ভূত কাজই করে যাচ্ছেন, যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বহু প্রতীক্ষিত ছাত্র সংসদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লাঠি হাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের ছিন্নমূল মানুষকে বিতারিত করা ছাত্র সংসদের প্রতিনিধির কাজ না। কিংবা কোনো শিক্ষককে মারতে উদ্যত হওয়ার ক্ষমতা তারা রাখেন না। ডিন বা শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগপত্র সই করানোর কাজ তাদের নয়। শিক্ষক বা ডিনের বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে তা তদন্ত করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখতিয়ারও এ প্রশাসনের। আবার ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী থাকবে কিনা বা ক্যাম্পাসে বহিরাগতরা প্রবেশ করবে কিনা সেসব বিষয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ছাত্র সংসদ প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতামত গ্রহণ সাপেক্ষে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। কিন্তু প্রতিনিধিদের আচরণে এর বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে। এতে সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দেয়া পোস্ট নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে তারা আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। সামাজিক ঐক্যের বদলে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, সামাজিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এমন বক্তব্য প্রকাশ করছেন। এ যেন ছাত্ররাজনীতির পুরনো ধারারই প্রতিচ্ছবি। অথচ পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত থেকে বেরিয়ে গণতান্ত্রিক পথে যাত্রার প্রত্যয়ে সংঘটিত হয়েছিল চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান। আর এর ধারাবাহিকতায় ‍বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয় রাজনীতির দখলমুক্ত করার অভিপ্রায়ে অগ্রাধিকার পায় ছাত্র-সংসদ নির্বাচন।

বিগত সময়ে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষত সরকারি বিশ্ববিদ্যালগুলো অতিমাত্রায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শিকার হয়েছে। ছাত্ররাজনীতির নামে ক্ষমতাসীন সরকার ও তার সহযোগী সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে দেখা গেছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে সিট পাওয়া থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। ভিন্ন ধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীসহ ভিন্ন মত প্রকাশকারী শিক্ষার্থীদের ওপর চলেছে নানা কায়দায় দমন-পীড়ন। একই চর্চা দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির ক্ষেত্রেও। শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা আরো ভয়াবহ পরিণতি বয়ে এনেছে। এসব শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠদানে মনোযোগ না দিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন রাজনৈতিক বিষয়াদিতে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগও হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক বিবেচনা প্রসূত। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন একের পর এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখন তা শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি বয়ে এনেছিল। কিন্তু সে স্বস্তি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়নি। বরং নতুন নেতৃত্ব নতুনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতির বীজ বপনের কৌশল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

ছাত্র প্রতিনিধিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরে রাখা সমীচীন। তাদেরকে মনোযোগী হতে হবে একাডেমিক উৎকর্ষ কীভাবে বাড়ানো যায় এবং শিক্ষার্থীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চায় গুণগত পরিবর্তন আনা যায়। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের দাবি ও অধিকারের কথা তুলতে পারে, সেই ভরসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক, বিভাজন তৈরি হোক তা কখনই গ্রহণযোগ্য হবে না। ছাত্র সংসদকে বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে সম্মিলিতভাবে অংশ নেয়ার সুযোগ তৈরিতে কাজ করে যেতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো প্রশাসনিক কাজ ও ছাত্র সংসদের দায়িত্বের মধ্যে যে সীমারেখা রয়েছে তা অতিক্রম না করার বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন থাকা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। দেশের বড় বড় আন্দোলনেও এ সংসদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় দেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় বারবার ব্যাঘাত ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও। যে কারণে এক সময় প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাই বলা যায়। এখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মনে রাখা প্রয়োজন তারা যদি দায়িত্বশীল আচরণ না করেন, তাহলে ভবিষ্যতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।